অর্থনীতি

জুনে চমক দেখিয়েও রপ্তানিতে পতন

সদ্যসমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরের রপ্তানি জুলাই মাসে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। জুনে এসে শেষও হয় দুর্দান্ত প্রবৃদ্ধি দিয়ে। তবে সার্বিকভাবে অর্থবছরটির রপ্তানি আয় শেষ হয়েছে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতেই।

Advertisement

রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা আগেই এমন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

অর্থবছরের সব শেষ মাস জুনে রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মাসটিতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের জুনের ৩ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি।

বছরের শুরু অর্থাৎ জুলাই মাসেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে চমক ছিল। আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই মাসের ৩ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি।

Advertisement

আরও পড়ুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে দশমিক ৫৮ শতাংশ

তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারেনি, বরং সামান্য পতনও হয়েছে। এ সময় দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।

তৈরি পোশাক রপ্তানির চিত্র

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ০ দশমিক ৬১ শতাংশ কমে হয়েছে ১৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার।

তবে জুন মাসে আরএমজি খাতের রপ্তানি আয় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ সময় নিট ও ওভেন- উভয় উপখাতেই দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

যে কারণে পতন

রপ্তানিকারকদের মতে, চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, সরবরাহ ও উৎপাদন পরিকল্পনায় বিঘ্ন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীনের বাড়তি প্রতিযোগিতার কারণে সার্বিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

Advertisement

আরও পড়ুন রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার ভার নিয়েই নতুন অর্থবছরে যাত্রা

তবে ইপিবির দাবি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও প্রধান বাজারগুলোতে দুর্বল ভোক্তা চাহিদার মধ্যেও রপ্তানি আয় প্রায় স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।সংস্থাটি জানায়, ‘রপ্তানি খাতের এই স্থিতিশীলতা খাতটির অন্তর্নিহিত সক্ষমতা ও অভিযোজন ক্ষমতার প্রতিফলন।’

ব্যবসায়ী নেতারা আশা প্রকাশ করে বলেন, চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাত যুদ্ধবিরতির দিকে গেলে এবং তেলের দাম কমলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে নতুন ক্রয়াদেশও বাড়তে পারে।

সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক অনিশ্চয়তা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বার্ষিক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ভারত ও ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে।-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান

রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুন মাসের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি মূলত ‘বেস ইফেক্ট’র ফল। আগের মাসগুলোতে ছুটির কারণে রপ্তানি কার্যক্রম ধীরগতির ছিল এবং সেই সময়ের অনেক চালান জুন মাসে সম্পন্ন হওয়ায় ওই মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা গেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘জুন মাসে প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হলেও প্রকৃত রপ্তানি আয় মাসিক গড়ের কাছাকাছিই ছিল। কারণ ২০২৫ সালের একই সময়ে ঈদুল আজহার ছুটির প্রভাব থাকায় তুলনামূলক ভিত্তি দুর্বল ছিল।’

আরও পড়ুন রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচকে ফেরাই হবে বড় প্রাপ্তি

তার ভাষ্য, ‘সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক অনিশ্চয়তা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বার্ষিক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ভারত ও ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে।’

বিশ্ববাজারে দুর্বল চাহিদা ও ক্রেতাদের কম দাম প্রস্তাবের কারণে অনেক কারখানা লোকসানে পড়েছে। মজুরি, সুতা, রং, রাসায়নিক, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।-বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান 

দেশের গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪–১৫ শতাংশ, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতি বছর মজুরি বাড়ার চাপ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে দুর্বল চাহিদা ও ক্রেতাদের কম দাম প্রস্তাবের কারণে অনেক কারখানা লোকসানে পড়েছে। মজুরি, সুতা, রং, রাসায়নিক, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’

প্রধান প্রধান খাতের রপ্তানির চিত্র

২০২৫–২৬ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ৯৭৫ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আর পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৮৮৪ মিলিয়ন ডলার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার এবং হোম টেক্সটাইল রপ্তানি ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে ৯২৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রকৌশল পণ্যে। এ খাতের রপ্তানি ২১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ৬৫২ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

আইএইচও/এএসএ/এমএফএ