বাংলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষাগুলোর একটি। মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা ৩০ কোটিরও বেশি। ভাষার সংখ্যাগত শক্তি, সমৃদ্ধ সাহিত্য-ঐতিহ্য এবং ভাষার জন্য আত্মত্যাগের অনন্য ইতিহাস—সব মিলিয়ে বাংলা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ মর্যাদার দাবিদার। অথচ আজও জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার তালিকায় বাংলার স্থান হয়নি। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে দুই দশক ধরে (২০০৬ সাল থেকে) যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামকেন্দ্রিক একটি প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠন ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গড়ে তোলার কাজ করে যাচ্ছে।
Advertisement
Organisation for the Recognition of Bangla as an Official Language of the United Nations নামের এই সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতিনির্ভর চাপসৃষ্টিকারী (প্রেসার) গ্রুপ। তাদের লক্ষ্য একটিই—বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তোলা। এ উদ্দেশ্যে তারা বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় করে আসছে। সংগঠনটির উদ্যোগে শুরু হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। ২০১৬ সালে এই সংগঠনের যুক্তরাজ্যের আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
সংগঠনটির দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একাধিক সদস্য নীতিগত সমর্থন প্রকাশ করেছেন। একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্য সরকারও অতীতে এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশেও বিষয়টি নিয়ে একসময় ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে তখন জাতিসংঘে নতুন একটি দাপ্তরিক ভাষা সংযোজনের সম্ভাব্য ব্যয়ভার হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বাংলাদেশের বহনের প্রশ্ন সামনে আসায় উদ্যোগটি গতি হারায়। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিষয়টি আরও আড়ালে চলে যায়।
জাতিসংঘে বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি সহজ বা স্বল্পমেয়াদি কোনো প্রক্রিয়া নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সমর্থন, আর্থিক প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে ভাষার জন্য একটি জাতি জীবন দিয়েছে, সেই ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস কখনোই অযৌক্তিক হতে পারে না।
Advertisement
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যয় কি বাংলাদেশের জন্য সত্যিই এত বড় বাধা? রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পে বাংলাদেশ নিয়মিত হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করে থাকে। সেই তুলনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। এটি শুধু ভাষার স্বীকৃতির বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের বৈশ্বিক স্বীকৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোই নিজেদের আদর্শের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। তাই এ ধরনের জাতীয় প্রশ্নে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বদলীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠাই সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে এ বিষয়ে একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জাতীয় স্বার্থেই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ভাষার মর্যাদা কোনো একক দলের নয়; এটি সমগ্র জাতির গৌরব।
এ বছর বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের কূটনৈতিক সক্রিয়তাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। যদিও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্ব এবং জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা নির্ধারণ দুটি পৃথক প্রক্রিয়া, তবুও বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার ক্ষেত্রে এটি একটি অনুকূল সময় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে, এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সূচনালগ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. তোজাম্মেল টনি হক এবং সাধারণ সম্পাদক তফাজ্জুল হোসেন চৌধুরী। বর্তমানে সংগঠনটির কার্যক্রম যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশেও বিস্তৃত হয়েছে। তাদের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টায় শুরু থেকেই সহযোগিতা দিয়ে আসছে বার্মিংহামের বাংলাদেশ মাল্টিপারপাস সেন্টার।
Advertisement
জাতিসংঘে বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি সহজ বা স্বল্পমেয়াদি কোনো প্রক্রিয়া নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সমর্থন, আর্থিক প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে ভাষার জন্য একটি জাতি জীবন দিয়েছে, সেই ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস কখনোই অযৌক্তিক হতে পারে না।
বাংলাদেশ যদি এই উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার কেবল আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বৈশ্বিক পরিসরে আরও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বাংলাদেশের পরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করতে জাতিসংঘে বাংলার দাপ্তরিক স্বীকৃতি অর্জনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি দূরদর্শী ও কৌশলগত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/জেআইএম