আইন-আদালত

সুখরঞ্জন বালী গুমের অভিযোগে সাবেক এএসপি ফজলুর রহমান কারাগারে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে ২০১২ সালে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে গুমের ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখার আবেদন মঞ্জুর করে শুক্রবার (৩ জুলাই) এ আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম।

আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ মো. মোরশেদ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে রাজধানীর বাড্ডা এলাকার একটি বাসা থেকে ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম।

Advertisement

আদালতে দাখিল করা আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে আইনজীবীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকে যান সুখরঞ্জন বালী। সেখানে পৌঁছানোর পর সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাকে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে একটি সাদা ডবল কেবিন গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে চোখ বেঁধে প্রায় দুই মাস অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে সুখরঞ্জন বালীকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ বছর আটক থাকার পর দেশটির গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে তার ছেলে অপূর্ব বালী ভারতে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় বাবাকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনেন।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তদন্তে পাওয়া প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণে দেখা গেছে, ঘটনার দিন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের দুটি ডবল কেবিন গাড়িতে করে ফজলুর রহমান এবং তার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের সামনে থেকে সুখরঞ্জন বালীকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে তাকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, এ ঘটনায় ফজলুর রহমানের সম্পৃক্ততার পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন ডিবির সংবাদ সম্মেলন / সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জনকে থাপ্পড় মেরে কলার ধরে গাড়িতে তোলেন এএসপি ফজলুর

২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালী নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে বলে জানানো হলেও তার পরিবার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করে, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল।

Advertisement

পরে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ করেন সুখরঞ্জন বালী। অভিযোগে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং পরে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জেরেই তিনি গুম ও নির্যাতনের শিকার হন।

ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়। অভিযুক্তদের তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বিচারক এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।

এদিকে শুক্রবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রিকুইজিশনের ভিত্তিতে ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিবিতে কর্মরত থাকাকালে ফজলুর রহমান ও তার টিম সুখরঞ্জন বালীকে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিল। এমনকি তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ফজলুর রহমান তার গালে চড় মারেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারের পর ফজলুর রহমানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এমডিএএ/একিউএফ