প্রবাস

মালয়েশিয়ায় বিশেষ অভিযানে বাংলাদেশিসহ আটক ১৪৬

মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসন, অননুমোদিত কর্মসংস্থান এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে দেশজুড়ে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ (জেআইএম)।

Advertisement

সর্বশেষ পৃথক তিনটি অভিযানে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মোট ১৪৬ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতা ও নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদেশিকর্মী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, অবৈধ শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মালয়েশিয়া সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, এসব অভিযান তারই ধারাবাহিকতা।

মালয়েশিয়ার কেলান্তান সীমান্তে বিশেষ অভিযানে বাংলাদেশের আটজনসহ মোট ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে/ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

সবচেয়ে বড় অভিযানটি পরিচালিত হয় সেলাঙ্গরের ক্লাংয়ের পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র প্লাজা জিএমে। ‘অপস মেগা’ নামে পরিচালিত এ অভিযানে ৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে ৩২৭ জনের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে চীন, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ৮৬ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়।

আরও পড়ুন মালয়েশিয়ায় বিশেষ অভিযানে বাংলাদেশিসহ ৩৯ বিদেশি আটক

ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন আইন ১৯৫৯/৬৩ এবং ১৯৬৩ সালের ইমিগ্রেশন বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের সময় কয়েকজন বিদেশি পালানোর চেষ্টা করলেও ড্রোন নজরদারি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত অভিযানে তাদের আটক করা হয়। তদন্তে সহায়তার জন্য ১১ জন মালয়েশীয় নাগরিকের বিরুদ্ধেও সমন জারি করা হয়েছে।

দুই সপ্তাহের গোয়েন্দা নজরদারি এবং জনসাধারণের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে ইমিগ্রেশন বিভাগের পাশাপাশি রয়্যাল মালয়েশিয়ান কাস্টমস বিভাগ, জাতীয় নিবন্ধন বিভাগ (জেপিএন) এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও অংশ নেন। এতে মোট ১২৫ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন।

সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাও ব্যর্থ

একই সময়ে কেলান্তান সীমান্তে পৃথক বিশেষ অভিযানে বাংলাদেশের আটজনসহ মোট ১৩ জন বিদেশিকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন ইন্দোনেশীয় পুরুষ, একজন ইন্দোনেশীয় নারী এবং একজন মিয়ানমারের নারী রয়েছেন।

Advertisement

ইমিগ্রেশনের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আটক ব্যক্তিদের কয়েকজন মালয়েশিয়ায় প্রবেশে কালোতালিকাভুক্ত ছিলেন। তারা সীমান্তের অননুমোদিত পথ বা ‘ইঁদুরপথ’ ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট এড়িয়ে দেশে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন।

আরও পড়ুন মালয়েশিয়ায় পাঁচদিনে ৪৭১ অবৈধ অভিবাসী-৩১ নিয়োগকর্তা আটক

অভিযানে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মোট আটটি পাসপোর্ট এবং একটি প্রোটন প্রেভে গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে।

নির্মাণ খাতেও অভিযান

এদিকে পাহাংয়ের ক্যামেরন হাইল্যান্ডসে একটি নির্মাণ প্রকল্পে পরিচালিত অভিযানে আরও ৪৭ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। মোট ৫৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ৪৭ জনকে বিভিন্ন অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করে ১৪ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। পরে তাদের কেমায়ান ইমিগ্রেশন ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

পাহাং ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এ অভিযান পরিচালিত হয়।

সরকারের কঠোর বার্তা

সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া সরকার বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন, একক সমন্বয় ব্যবস্থার আওতায় আনা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং অবৈধ কর্মসংস্থান দমনে একাধিক পদক্ষেপ এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন মালয়েশিয়ায় ৭৮ অবৈধ অভিবাসীকে সাজা দিলো আদালত

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভিযানের লক্ষ্য শুধু অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেফতার নয়; বরং বিদেশি কর্মী নিয়োগে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, মানবপাচার চক্রের তৎপরতা এবং অবৈধ শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে আনা। একই সঙ্গে বৈধভাবে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি অধিক সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এসব অভিযান গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্মীদের অবশ্যই বৈধ ভিসা, কার্যকর ওয়ার্ক পারমিট এবং অনুমোদিত নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শুধু কর্মী নয়, নিয়োগদাতা এবং আশ্রয়দাতার বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইমিগ্রেশন বিভাগ জানিয়েছে, মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসন এবং অননুমোদিত বিদেশি কর্মসংস্থান দমনে দেশজুড়ে সমন্বিত অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

এমএমকে