আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনের হামলার আওতায় রুশ ‘নিরাপদ অঞ্চল’, মস্কো রক্ষায় চাপ বাড়ছে

রাশিয়ার ভেতরে যে কোনো এলাকায় নিজেদের পছন্দমতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। এমনকি রাশিয়ার অভ্যন্তরে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ও ইউক্রেনের মিসাইল রেঞ্জের আওতায় এসেছে এবং ক্রমেই তা প্রমাণিত হচ্ছে বলে ৩ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

Advertisement

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে এখন নিরাপদ এলাকা ধীরে ধীরে কমে আসছে। ইউক্রেনের হামলায় রুশ তেল স্থাপনা, অস্ত্র কারখানা, সামরিক বহর এবং কৌশলগত বোমারু বিমান একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে যৌথ অভিযানে রাশিয়ার নিজনি নভগোরোদ তেল শোধনাগার এবং কস্তোভো শহরের স্টারোলিকেয়েভো তেল পাম্পিং স্টেশনে হামলা চালানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা ইউক্রেনিফর্মের তথ্য মতে, গত ২ জুলাই ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা (Security Service of Ukraine) (এসএসইউ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বারবার তেল শোধনাগারে হামলার কারণে রাশিয়া জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। শুক্রবার (৩ জুলাই) রাশিয়ায় তেলের জন্য গাড়ির লাইন দেখা গেছে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য কিয়েভ পোস্ট এবং ইউরো নিউজ।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা—যেমন মধ্য মস্কো এবং একটি প্রেসিডেন্সিয়াল বাসভবন—রক্ষায় রাশিয়া তাদের অধিকাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়েছে। ফলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তুলনামূলকভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।

Advertisement

অন্যদিকে, হামলার কারণে কিছু ‘সমস্যা ও নির্দিষ্ট ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে, তিনি এসব হামলার ক্ষয়ক্ষতির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

এদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রেখেছে। রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রাজধানী কিয়েভে প্রতিদিন ই নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। দুই দিনে অন্তত ২১ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। আজ শনিবার আরও অন্তত ৬ জন নিহত এবং ২১ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে দোনেৎস্ক ফ্রন্টে ব্যাপক হতাহতের পরও রুশ বাহিনী অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

দূরপাল্লার হামলায় নতুন কৌশল

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সম্প্রতি বারবার দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা (Long-range sanctions) শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে শত শত কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলার চালানোর সক্ষমতাকে ইঙ্গিত করছে। যুদ্ধের কয়েক বছরে ইউক্রেনের অস্ত্র ও কৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।

এর উদাহরণ- সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্ট নির্মিত ফ্লেমিংগো ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার টাইটান-বারিকাদি কারখানায় আঘাত হানছে। এই কারখানায় রুশ সামরিক বাহিনির জন্য আর্টিলারি সিস্টেম তৈরি করা হয়। গত বছর প্রকাশিত স্পাইডারওয়েব অভিযানের ভিডিওতেও দেখা যায়, সীমান্ত পেরিয়ে গোপনে আনা ছোট ড্রোন বিস্ফোরক বহন করে খোলা জায়গায় রাখা রুশ যুদ্ধবিমানে আঘাত হানছে।

Advertisement

এদিকে ইউক্রেনের ধারাবাহিক দূরপাল্লার ড্রোন হামলা এবং ন্যাটোর সহায়তায় নতুন প্রজন্মের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কারণে প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করেছে রাশিয়া। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর চারপাশে নতুন একটি আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় নির্মাণের তথ্য উঠে এসেছে স্যাটেলাইট চিত্রে। নতুন ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে অন্তত পাঁচটি প্রতিরক্ষা অবস্থান। এসব স্থান দীর্ঘপাল্লার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মোতায়েনস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

কয়েকটি স্থানে এর মধ্যে এস-৪০০-এর লঞ্চার এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক যান মোতায়েন করা হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নতুন প্রতিরক্ষা বলয়টি ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে অথবা খুব শিগগির পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।

দেশীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা

যুদ্ধের শুরু তথা ২০২২ সালের তুলনায় বর্তমানে নিজেদের উৎপাদিত অস্ত্র ব্যবহার বাড়িয়েছে ইউক্রেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনী মূলত নিজস্ব উৎপাদিত ড্রোন এবং আধুনিকায়ন করা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। পাশাপাশি সীমান্ত থেকে অনেক দূরের মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো এলাকাও এখন ইউক্রেনের হামলার আওতায় এসেছে।

আরও পড়ুন>>রাজধানী মস্কো রক্ষায় এস-৪০০ মোতায়েন, বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় গঠন

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

Center for Strategic and International Studies (CSIS) গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৬ সালে ইউক্রেন স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার রসদ (যুদ্ধ চালানোর অস্ত্র ও অন্যান্য সহযোগীতা) এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করার কৌশল নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত বিমান প্রতিরোধমূলক অভিযানের আধুনিক রূপ ইউক্রেনের এই কৌশল। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে মোট হতাহত (নিহত ও আহত মিলিয়ে) প্রায় ১৪ লাখে দাঁড়িয়েছে।

জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনতে ইউক্রেন ৪০ দিনের একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি।

২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আছে রাশিয়া। এতে দুই দেশেরই বহু সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে, সম্প্রতি পুতিন জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রয়েছে রাশিয়া। অ্যাংকোরেজ ও ইস্তাম্বুল চুক্তি এবং বর্তমান বাস্তবতার ভিত্তিতে এই আলোচনা হতে হবে।

গত বছর ইস্তাম্বুলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে পুনরায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনার তিনটি দফা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ১৬ মে, ২ জুন এবং ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকে বড় আকারের বন্দি বিনিময় এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির জন্য উভয় পক্ষের অবস্থান তুলে ধরে খসড়া স্মারক তৈরি হয়র

কেএম