সম্প্রতি এক অনলাইন লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শায়েখ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ইসলামে খেলাধুলার বিধান কি? সম্প্রতি আলেমদের অ্যাক্টিভিটিজ দেখে মনে হচ্ছে কোনো খেলাধুলাই করা যাবে না। কিন্তু একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য তো বিনোদনের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি?
Advertisement
এই প্রশ্নের জবাবে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন,
একজন মানুষের সুস্থভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবকিছুর ব্যবস্থাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের জন্য রেখেছেন। আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানে এমন অনেক স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা মানুষের সুস্থ বিনোদনের খোরাক জোগায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইসলাম আমাদেরকে সুন্দর পারিবারিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য একটি আনন্দময় পরিবার হলো সবচেয়ে বড় উপাদান। কিন্তু আজকের আধুনিক পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ এই পারিবারিক আবহ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে।
পারিবারিক বন্ধন থেকে যে মানসিক প্রশান্তি আসে, সে প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনেও ইঙ্গিত করেছেন। হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টির পর তিনি যখন কিছুটা একাকিত্ব ও বিষণ্নতা অনুভব করছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গী হিসেবে হজরত হাওয়াকে (আ.) সৃষ্টি করলেন। যেন তিনি তার সঙ্গিনীর সান্নিধ্যে গিয়ে মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন।
Advertisement
সুতরাং মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সুস্থ বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির নানাবিধ উপায় অবলম্বন করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এই উপায়টি যদি প্রাকৃতিক হয় এবং আল্লাহর দেওয়া ব্যবস্থার ভেতরে থেকে মানুষ তা খোঁজার চেষ্টা করে, তবেই তা মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানসিক সুখ দিতে পারে।
বর্তমানে খেলাধুলা দেখা, তা উপভোগ করা বা তা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকার মাধ্যমে আমরা যে বিনোদন পাওয়ার চেষ্টা করছি, কিংবা মানসিক সুখের জন্য আমরা যেসব কৃত্রিম পথ বের করেছি, সেগুলো কি আদৌ আমাদের প্রকৃত সুখ দিতে পারছে? আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখব প্রায় প্রতিটি দেশেই মানুষ তীব্র ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোগে পরিণত হবে এই মানসিক ব্যাধি। এত খেলাধুলার ইভেন্ট ও বিনোদনের এত জমকালো আয়োজন থাকার পরও কেন মানসিক রোগ এভাবে বাড়ছে? এর কারণ হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের মানসিক প্রশান্তির যে স্বাভাবিক পথগুলো বাতলে দিয়েছেন, আমরা সেগুলো থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের তৈরি কৃত্রিম সুখের পেছনে ছুটছি। এই কৃত্রিম বিনোদনগুলো মানুষকে দিন দিন আরও বেশি অস্থির ও বিষণ্ন করে তুলছে।
ইসলামে খেলাধুলা ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ নয়। বিশেষ করে যেসব খেলায় শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের সুযোগ থাকে, ইসলাম সেগুলোকে যথেষ্ট উৎসাহিত করে। নবী করীম (সা.) নিজে তাঁর স্ত্রী হজরত আয়েশার (রা.) সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এ ছাড়া মানুষের বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে—এমন সব প্রতিযোগিতা যেমন ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজি কিংবা কুস্তির মতো খেলাধুলার প্রতি নবীজি (সা.) উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
আরও পড়ুন ডা. জাকির নায়েক / ইসলামে ফুটবল খেলা ও পেশা হিসেবে নেওয়ার বিধান কী?সুতরাং যেসব খেলায় ফিজিক্যাল ফিটনেস বৃদ্ধির সুযোগ থাকে, শরিয়ত সেগুলোকে নিষেধ করে না। একইভাবে ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো আধুনিক খেলাগুলোও শরিয়তের পরিপন্থী নয়, যদি সেখানে কোনো হারাম উপাদান না থাকে। যেমন ফুটবলে যদি সতর উন্মুক্ত না করে খেলা যায় এবং সেখানে যদি কোনো জুয়া বা বাজি ধরার মতো বিষয় না থাকে, তবে শরিয়ত তা নিষিদ্ধ করে না।
Advertisement
তবে যে কোনো বৈধ খেলাই যখন মানুষের কাছে খেলার চেয়ে বড় কিছু হয়ে দাঁড়ায়, যখন এটি মানুষের পূর্ণ মনোযোগ কেড়ে নিয়ে ইবাদত-বন্দেগিতে উদাসীনতা তৈরি করে, তখন সেখানে শরিয়তের বিধিনিষেধ চলে আসে।
আর যেসব খেলায় কোনো শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম নেই, যেমন পাশা খেলা, দাবা বা লুডু—এগুলোকে শরিয়ত নিরুৎসাহিত করেছে এবং ফকিহগণের ঐক্যমত্যে এগুলোকে এক প্রকার নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। কারণ এসব খেলা মানুষকে কোনো শারীরিক বা মানসিক প্রশান্তি দেয় না, বরং মানুষের মানসিক অস্থিরতা ও ডিপ্রেশন আরও বাড়িয়ে দেয়। সমাজে দেখা যায়, যারা তাস, ক্যারামবোর্ড বা এ জাতীয় খেলায় মগ্ন থাকে এবং এগুলোকে জুয়ায় রূপান্তর করে, তারা মানসিকভাবে সুখে থাকে না। তাদের জীবনযাপন সাধারণত বেশ অগোছালো ও পরিকল্পনাহীন হয়ে থাকে।
সুতরাং ইসলামে খেলাধুলা নিষিদ্ধ নয়, বরং শারীরিক কসরত থাকা এবং হারাম উপাদান থেকে মুক্ত থাকার শর্তে খেলাধুলার অনুমোদন রয়েছে।
আরও পড়ুন শায়খ আহমাদুল্লাহ / ভিন্ন চোখে ফুটবল বিশ্বকাপসূত্র: ইউটিউব, শায়েখ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল চ্যানেল
ওএফএফ