মতামত

তোমাদের কাছে আছে ঘড়ি, আমাদের আছে সময়

ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল ত্রিমুখী লড়াই শুরুর সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। বারবার চুক্তি করার নামে যুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্লান্ত হয়ে নানা মন্তব্য করে নিজের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করছেন। হরমুজ থেকে তেল হাইজ্যাক করে নেওয়ার জন্য মিত্রদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হওয়ায় ইরানের সঙ্গে চুক্তি করে যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা করার কূটকৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু খেলা চলাকালীন পুনঃপুন হামলা সংঘটিত হয়েছে। সর্বশেষ ২ জুলাই কাতারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চুক্তি সইয়ের নামে পুনরায় ইরানি শীর্ষ নেতাদের হত্যা করার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন মার্কিন কোনো কোনো প্রতিনিধি। তবে ইরানও নাছোড়বান্দা। তারা মার্কিন আক্রমণ প্রতিহত করতে বদ্ধপরিকর। ইরান বহির্বিশ্বের সঙ্গে নানা কৌশলগত যোগাযোগের মাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি এই প্রবন্ধের শিরোনামে ব্যবহৃত আফগানদের ঐতিহাসিক উক্তিটি পুনর্ব্যক্ত করে নিজেদের নৈতিক সাহস বাড়িয়ে তুলেছে।

Advertisement

আর সেটি হলো, ‘তোমাদের কাছে আছে ঘড়ি, আর আমাদের আছে সময়।’ এই উক্তিটি আফগানদের মতো ইরানিরাও এখন মার্কিনদের উদ্দেশে ব্যবহার করছে। এই উক্তিটি মূলত আফগান প্রতিরোধযোদ্ধাদের, বিশেষ করে তালেবান ও মুজাহিদিনদের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা, যা পরে পশ্চিমা বিশ্লেষক ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি তালেবান নেতাদের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এর নির্ভরযোগ্য একক উৎস নেই। এই উক্তিটি প্রায়ই মোল্লা ওমরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যদিও ইতিহাসবিদরা মনে করেন এটি তাঁর সরাসরি উক্তি নয়। এটি মূলত তালেবান ও আফগান প্রতিরোধের একটি প্রতীকী বক্তব্য, যা পরে তাঁর নামের সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে যায়।

তবে এটি একটি সামষ্টিক অভিজ্ঞতার প্রকাশ। এই উক্তিটি করা হয়েছিল একটি কৌশলগত বাস্তবতা তুলে ধরতে। আফগান যোদ্ধারা জানত যে, তারা সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি এবং আধুনিক অস্ত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত বাহিনীর মতো শক্তিধর প্রতিপক্ষের সমকক্ষ নয়। তাই তারা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল নেয়। তাদের বিশ্বাস ছিল, বিদেশি শক্তি দ্রুত ফলাফল চায় (ঘড়ি ধরে), কিন্তু আফগানরা নিজেরা ধৈর্য ধরে দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চেয়েছিল, যুদ্ধের ফলাফল শুধু শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং ধৈর্য, সহনশীলতা এবং সময় ব্যবহারের ওপরও নির্ভর করে। এই দর্শনই আফগানিস্তানের দীর্ঘ সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

গভীর অর্থবহ উক্তিটি প্রথম বিশ্বজুড়ে আলোচিত হলেও আজ বহু বছর পর একই উক্তি আবার ফিরে এসেছে নতুন প্রেক্ষাপটে—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মারাত্মক সংঘাতকে ঘিরে। যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পর যখন এই বার্তাটি ইরানিদের মুখে শোনা যায়, তখন তা কেবল একটি আফগান উক্তি না থেকে ইরানি নেতাদের একটি কৌশলগত ঘোষণা এবং একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শেষার্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র দম্ভ করে বলেছিল, এই যুদ্ধে ইরান এক সপ্তাহও টিকতে পারবে না। অথচ ১ জুলাই ২০২৬ পেরিয়ে গেলে তাদের মুখ থেকেই শোনা যাচ্ছে যে, এই যুদ্ধে কার্যত ইরানের জয় হয়েছে।

Advertisement

আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র অনেক বদলে গেছে। একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল সামরিক শক্তির সরাসরি সংঘর্ষ; কিন্তু এখন যুদ্ধ শুধু ময়দানে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতি, তথ্য, কূটনীতি এবং সময়ের ওপর নির্ভরশীল এক বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি যেখানে উন্নত প্রযুক্তি, নির্ভুল অস্ত্র এবং দ্রুত আঘাত হানার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, সেখানে ইরানের মতো দেশ বুঝে গেছে যে, সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে টিকে থাকা কঠিন। তাই তারা বেছে নিয়েছে ভিন্ন পথ—সময়কে দীর্ঘায়িত করা, সংঘাতকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা।

ইরান এখনও অনড়। তারা ভবিষ্যতের যে কোনো হুমকির মুখে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ইরান এখন আফগানিস্তানের সংগ্রামের সেই প্রতীকী উক্তি—‘তোমাদের কাছে ঘড়ি আছে, আর আমাদের আছে সময়’—ব্যবহার করছে। যার অর্থ, মার্কিন সেনারা সম্মুখসমরে আসুক; তাদের এবার কফিনে পুরে দেশে পাঠানো হবে। সেজন্য তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।

তিন মাস ২০ দিন একটি যুদ্ধের জন্য খুব বেশি সময় নয়, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক মাইলফলক। এই সময়ের মধ্যে যদি কোনো পক্ষ দ্রুত বিজয় অর্জন করতে না পারে, তাহলে যুদ্ধের গতি বদলাতে শুরু করে। ইরান এই সময়টিকে ব্যবহার করছে একটি বার্তা দেওয়ার জন্য। তারা প্রস্তুত দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য। তারা জানিয়ে দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে না এবং তারা ক্লান্ত হবে না।

ইতিহাস আমাদের বারবার এই শিক্ষা দিয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ—সবখানেই দেখা গেছে যে, প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল পক্ষ সময়কে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। ইরান সেই ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নিচ্ছে। তারা জানে, সরাসরি সংঘর্ষে হয়তো তারা পিছিয়ে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে।

Advertisement

তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও কম নয়। দীর্ঘ যুদ্ধ মানে নিজ দেশের জন্যও অর্থনৈতিক চাপ, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। ইরানের জন্য এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা—একদিকে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। তারা কি দ্রুত ফলাফল আনতে পারবে, নাকি তারা আবারও একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে? তাদের সামরিক শক্তি প্রশ্নাতীত, কিন্তু এই শক্তি কত দিন কার্যকর রাখা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এই উক্তি আমাদের একটি বড় সত্যের সামনে দাঁড় করায়। তা হলো, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধের প্রকৃতি একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে—যুদ্ধে সময়কে যারা বুঝতে পারে, তারাই ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারে। পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইরান সেটাই করেছে।

এই উক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে হলে আমাদের আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ১৯৮০-এর দশকের যুদ্ধ হোক কিংবা পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আফগান প্রতিরোধশক্তি সরাসরি সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু তারা জানত, সময় তাদের পক্ষে। তারা বুঝেছিল, একটি বিদেশি শক্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে একটি অপরিচিত ভূখণ্ডে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।

এই বাস্তবতাই জন্ম দিয়েছে ‘ঘড়ি বনাম সময়’ দর্শনের। এখানে ঘড়ি প্রতীক আধুনিকতা, প্রযুক্তি, নির্ভুলতা এবং দ্রুত ফলাফলের; আর সময় প্রতীক ধৈর্য, সহনশীলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর দেশ যেখানে দ্রুত আঘাত হেনে যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করতে চায়, সেখানে আফগান যোদ্ধারা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে সেই কৌশলকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। রাশিয়ার সঙ্গেও তারা তাই করেছিল।

এই উক্তির জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়, যখন পশ্চিমা সাংবাদিক ও বিশ্লেষকেরা আফগানিস্তানের যুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। তারা দেখান, কীভাবে প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর একটি বাহিনী অপেক্ষাকৃত দুর্বল কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রতিপক্ষের কাছে ধীরে ধীরে চাপে পড়ে। যুদ্ধের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস বিদেশি বাহিনীর জন্য হয়ে ওঠে ব্যয়বহুল—অর্থনৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এবং মানবিক দিক থেকেও।

তবে এই দর্শনের একটি অন্ধকার দিকও আছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মানে দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট। আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করেছে। অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হয়েছে। তাই সময় এখানে যেমন একটি অস্ত্র, তেমনি একটি বোঝাও।

এই উক্তির আরেকটি দিক হলো মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। এটি এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যা যুদ্ধের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যখন একটি শক্তিধর বাহিনী বুঝতে পারে যে, তাদের প্রতিপক্ষ সহজে হার মানবে না, তখন তাদের কৌশল পরিবর্তন করতে হয়।

এর আগে বলা হয়েছিল, ‘অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি সচলে সহযোগিতা না করায় মিত্র দেশগুলোর ওপর আবারও চটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর উচিত এখন সাহস সঞ্চয় করে হরমুজ প্রণালিতে যাওয়া এবং সেখান থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি “ছিনিয়ে নেওয়া”।’ ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে এসেও মার্কিন মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি। সম্প্রতি ইরানের ওপর আক্রমণের মাত্রা আবারও বেড়ে গেছে। ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে জবাব দিচ্ছে। এত কিছুর পরও ইরানের নৈতিক ও কৌশলগত বিজয়ের কথা যখন মার্কিনদের মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে, সেটিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইরানকে তাদের সামনের পরিকল্পনা সাজিয়ে রাখতে হবে।

তাই ইরান এখনও অনড়। তারা ভবিষ্যতের যেকোনো হুমকির মুখে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ইরান এখন আফগানিস্তানের সংগ্রামের সেই প্রতীকী উক্তি—‘তোমাদের কাছে ঘড়ি আছে, আর আমাদের আছে সময়’—ব্যবহার করছে। যার অর্থ, মার্কিন সেনারা সম্মুখসমরে আসুক; তাদের এবার কফিনে পুরে দেশে পাঠানো হবে। সেজন্য তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। ইরানের নেতারা নিজেদের হাতে অনেক সময় রয়েছে বলে দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে চলেছেন। এর অর্থ, মার্কিনরা মুখে যত মিষ্টি কথাই বলুক না কেন, ইরান কখনোই মাথা নোয়াবে না। তারা লোভী তেলগ্রাসীদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে নিজেদের প্রকৃত বিজয় হবে বলে আশা করে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।

এইচআর/জেআইএম