মতামত

যে জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে, তার পাখিদের কথোপকথন

‘তুমি কি আমাদের গাছটা দেখেছ?’

Advertisement

পশ্চিম আকাশে উড়ে যেতে যেতে ছোট্ট একটি পাখি প্রশ্ন করল তার সঙ্গীকে।

অন্য পাখিটি কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘গাছটা আর নেই। সেখানে এখন কংক্রিটের দেয়াল। মানুষ বলছে, ওটাই নাকি উন্নয়ন।’

প্রথম পাখিটি চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার বলল, ‘তাহলে আমাদের বাসা?’

Advertisement

‘বাসার জায়গা উন্নয়নের নকশায় থাকে না।’

তারপর দুটো পাখিই অনেকক্ষণ নীরব রইল। মানুষের পৃথিবীতে এমন নীরবতা খুব কমই দেখা যায়, কিন্তু প্রকৃতির নীরবতা ভয়ংকর। কারণ সেখানে শব্দ হারিয়ে যাওয়ার আগে জীবন হারিয়ে যায়।

এই কথোপকথন কাল্পনিক। কিন্তু এর বেদনা বাস্তব। পৃথিবীর প্রতিটি বন উজাড়ের পর, প্রতিটি শতবর্ষী গাছ কাটার পর, প্রতিটি জলাভূমি ভরাটের পর এমন হাজারো অদৃশ্য কথোপকথন হয়—যা আমরা শুনতে পাই না। কারণ আমরা করাতের শব্দ শুনি, কিন্তু ভাঙা বাসার শব্দ শুনি না; আমরা উন্নয়নের উদ্বোধন দেখি, কিন্তু একটি পাখির দেশান্তর দেখি না।

সভ্যতার ইতিহাস মূলত বন হারানোরও ইতিহাস। মানুষ যখন প্রথম কৃষিজমি বানিয়েছে, তখনও বন কেটেছে। শহর গড়েছে, তখনও কেটেছে। শিল্পবিপ্লবের সময় আরও বেশি কেটেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রশ্নটি আর বন কাটা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন এক পৃথিবী গড়ে তুলছি, যেখানে মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর থাকার অধিকার থাকবে না?

Advertisement

বাংলাদেশের দিকে তাকালেও একই উদ্বেগ দেখা যায়। পাহাড়ি বন, শালবন, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ, গ্রামীণ বৃক্ষরাজি, এমনকি শহরের পুরোনো গাছও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। কোথাও সড়ক, কোথাও শিল্পাঞ্চল, কোথাও আবাসন, কোথাও পর্যটনকেন্দ্র—সব কিছুরই প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রয়োজনের সঙ্গে প্রজ্ঞার সম্পর্ক না থাকলে উন্নয়ন একসময় আত্মবিনাশের অন্য নাম হয়ে ওঠে।

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, বন কোনো জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কিছু গাছের সমষ্টি নয়। একটি বন আসলে অসংখ্য জীবনের সম্মিলিত রাষ্ট্র। সেখানে পাখি আছে, মৌমাছি আছে, প্রজাপতি আছে, সাপ আছে, শেয়াল আছে, অণুজীব আছে। আছে অদৃশ্য সম্পর্কের এক বিস্ময়কর জাল। একটি গাছ কাটা মানে শুধু কাঠ পাওয়া নয়; একটি ক্ষুদ্র মহাবিশ্ব ধ্বংস করা।

পৃথিবী আমাদের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার নয়; এটি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি অমূল্য আমানত। সেই আমানতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। আর যেদিন শেষ পাখিটিও নীরব হয়ে যাবে, সেদিন মানুষ বুঝবে—আসলে জঙ্গল হারায়নি, হারিয়ে গেছে মানুষের নিজের হৃদয়ের সবুজ অংশটুকুই।

বিশ্বের পরিবেশবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করছেন, পৃথিবী এখন জীববৈচিত্র্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও অবাধ ভোগবাদ মিলিয়ে বহু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। এই বিলুপ্তি শুধু প্রাণীর নয়; মানুষের ভবিষ্যতেরও।

পাখিদের কথা ধরা যাক। তারা কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। তারা বন তৈরি করে, বীজ ছড়িয়ে দেয়, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে, ফুলের পরাগায়ন ঘটায়। প্রকৃতি তাদের মাধ্যমে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই যখন কোনো এলাকায় পাখি কমে যায়, তখন সেটি কেবল একটি প্রজাতির সংকট নয়; পুরো বাস্তুতন্ত্রের অসুস্থতার লক্ষণ।

বাংলাদেশের গ্রামে বড় হওয়া মানুষেরা জানেন, একসময় সকাল মানেই ছিল পাখির ডাক। দোয়েল, শালিক, বুলবুলি, কোকিল, মাছরাঙা—প্রতিটি ঋতুর নিজস্ব সুর ছিল। এখন সেই সুর অনেকটাই ক্ষীণ। শহরে শিশুরা অনেক সময় বইয়ে পাখির ছবি দেখে, কিন্তু বাস্তবে দেখে না। এটি শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়; এটি সাংস্কৃতিক দারিদ্র্যও।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অর্থনীতিরও সম্পর্ক। বন বৃষ্টি ধরে রাখে, মাটি রক্ষা করে, নদীকে বাঁচিয়ে রাখে, বাতাস পরিশুদ্ধ করে, কার্বন শোষণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বনভূমি হারানো মানে ভবিষ্যতের দুর্যোগকে আমন্ত্রণ জানানো। অথচ উন্নয়নের হিসাব করতে গিয়ে আমরা এসব অদৃশ্য সম্পদের মূল্য প্রায় কখনোই গণনা করি না।

অর্থনীতিবিদরা আজ ‘ন্যাচারাল ক্যাপিটাল’ বা প্রাকৃতিক পুঁজির কথা বলছেন। পৃথিবীর বহু দেশ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য অন্তর্ভুক্ত করছে। কারণ তারা বুঝেছে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে অর্জিত প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

বাংলাদেশের জন্য এই উপলব্ধি আরও জরুরি। কারণ আমরা এমন একটি ভূখণ্ডে বাস করি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টির ধরন বদলাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, নদী বদলে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বনভূমি কেবল পরিবেশের সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার কথা কেউ বলছে না। প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন কি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই হবে, নাকি প্রকৃতিকে সঙ্গী করেই হবে?

বিশ্বের বহু শহর আজ ‘গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ধারণাকে গ্রহণ করেছে। সেখানে গাছ কাটা শেষ বিকল্প, প্রথম নয়। রাস্তা নির্মাণের সময় পুরোনো বৃক্ষ সংরক্ষণের নকশা করা হয়। বন্যপ্রাণীর চলাচলের জন্য বিশেষ করিডোর রাখা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধারে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগ করা হয়। উন্নয়ন ও প্রকৃতি সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; অংশীদার।

আমাদের দেশেও সেই দর্শনের প্রয়োজন। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রকৃত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ বাড়াতে হবে। জলাভূমি ও পাহাড়কে উন্নয়নের ফাঁকা জমি হিসেবে নয়, জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্য মানুষের মনেই ঘটাতে হবে। আমরা সন্তানদের শেখাই পরীক্ষায় ভালো করতে, প্রতিযোগিতায় জিততে, সফল হতে। কিন্তু খুব কমই শেখাই একটি গাছের মূল্য, একটি পাখির প্রয়োজন, একটি নদীর ভাষা। যে সমাজ প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেকেও ভালোবাসতে পারে না।

ভাবুন, সত্যিই যদি একদিন সেই কাটা জঙ্গলের পাখিরা ফিরে আসে! তারা হয়তো আমাদের আদালতে দাঁড় করাবে না। তারা কোনো ক্ষতিপূরণও চাইবে না। তারা শুধু জানতে চাইবে, ‘তোমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করেছিলে, আমাদের ছাড়া তোমাদের পৃথিবী আরও সুন্দর হবে?’

সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের কাছে থাকবে না।

কারণ মানুষ যত উঁচু অট্টালিকাই নির্মাণ করুক, পাখিহীন আকাশ কখনো সভ্যতার প্রতীক হতে পারে না। যত বড় অর্থনীতিই গড়ে উঠুক, বনহীন দেশ কখনো নিরাপদ হতে পারে না। আর যত প্রযুক্তিই আবিষ্কার হোক, একটি হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তি এখনো মানুষের হাতে নেই।

যে জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে, তার পাখিদের কথোপকথন তাই নিছক কল্পনা নয়; এটি ভবিষ্যতের ইতিহাসের আগাম খসড়া। সেই ইতিহাসে আমরা কী পরিচয়ে বেঁচে থাকব—বনের হত্যাকারী হিসেবে, নাকি বন রক্ষার শেষ প্রহরী হিসেবে—সিদ্ধান্তটি এখনো আমাদের হাতে।

পৃথিবী আমাদের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার নয়; এটি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি অমূল্য আমানত। সেই আমানতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। আর যেদিন শেষ পাখিটিও নীরব হয়ে যাবে, সেদিন মানুষ বুঝবে—আসলে জঙ্গল হারায়নি, হারিয়ে গেছে মানুষের নিজের হৃদয়ের সবুজ অংশটুকুই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম