শামিম রেজা
Advertisement
দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে মানুষের পাশাপাশি কষ্ট পাচ্ছে পোষা ও পথপ্রাণীরাও। প্রচণ্ড গরমে পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, হজমজনিত জটিলতা এবং ত্বকের নানা সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে অনেক প্রাণী। অথচ সামান্য সচেতনতা ও কিছু নিয়ম মেনে চললে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পোষা প্রাণীদের সুরক্ষা ও যত্ন বিষয়ে কথা বলেছেন ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মতো প্রাণীরাও গরমে শারীরিক চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু তারা নিজেদের অসুবিধা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। তাই মালিকদেরই লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
গরমে যে ঝুঁকিগুলো সবচেয়ে বেশিডা. নাজিম উদ্দিন জানান, তীব্র গরমে প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন। পর্যাপ্ত পানি পান না করা কিংবা শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যাওয়ার ফলে এ সমস্যা তৈরি হয়।
Advertisement
তার ভাষ্য, সবচেয়ে ভয়ংকর ঝুঁকি হলো হিট স্ট্রোক। কুকুর ও বিড়ালের শরীরে মানুষের মতো পর্যাপ্ত ঘামগ্রন্থি নেই। ফলে তারা সহজে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অতিরিক্ত গরমে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারে।
এছাড়া গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বমি, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ে। ত্বকে র্যাশ, ফাঙ্গাল সংক্রমণ এবং টিক বা ফ্লির মতো পরজীবীর উপদ্রবও বেশি দেখা যায়। অনেক প্রাণী খাবারে অরুচিতে ভোগে, ফলে দুর্বলতা ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেনপ্রাণীর হিট স্ট্রোক দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। তিনি জানান, কোনো কুকুর বা বিড়াল যদি অস্বাভাবিকভাবে মুখ হা করে দ্রুত হাঁপাতে থাকে, মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরে, মাড়ি ও জিহ্বার রং উজ্জ্বল লাল, বেগুনি বা নীলচে হয়ে যায়, তাহলে সেটি বিপদের সংকেত হতে পারে।
এছাড়া শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হওয়া, দাঁড়াতে বা হাঁটতে সমস্যা হওয়া, শরীর কাঁপা, ঝিমিয়ে পড়া, হঠাৎ বমি বা ডায়রিয়া হওয়া এবং অচেতন হয়ে পড়াও হিট স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
Advertisement
অনেক মালিক এসব লক্ষণকে সাধারণ ক্লান্তি বা গরমের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যেতে পারে, এমনটাই জানান তিনি।
হিট স্ট্রোক হলে কী করবেনহিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণীটিকে রোদ বা গরম পরিবেশ থেকে সরিয়ে ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে নিতে হবে।
ডা. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘অনেকে বরফ বা খুব ঠান্ডা পানি ব্যবহার করেন, যা ঠিক নয়। এতে প্রাণীর শরীরে শক তৈরি হতে পারে।’
তার পরামর্শ, স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দিয়ে প্রাণীর শরীর ভিজিয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে মাথা, ঘাড়, পেট ও থাবার নিচে পানি দিলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। ভেজা শরীরের ওপর ফ্যানের বাতাস দিলে তাপমাত্রা আরও দ্রুত কমে।
প্রাণীটি সচেতন থাকলে তাকে অল্প অল্প করে পানি পান করানো যেতে পারে। তবে জোর করে পানি বা খাবার খাওয়ানো উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসার পরও অবশ্যই দ্রুত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। কারণ হিট স্ট্রোকের কারণে কিডনি, লিভার বা অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
খাবার ও পানির বিষয়ে বাড়তি যত্নগরমের সময়ে প্রাণীদের জন্য সার্বক্ষণিক পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন ডা. নাজিম উদ্দিন। প্রয়োজনে পানির পাত্রে এক-দুটি বরফের টুকরো দেওয়া যেতে পারে।
খাবারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারী ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। সহজপাচ্য ও তাজা খাবার দেওয়া ভালো।’
দুপুরের তীব্র গরমে খাবার না দিয়ে সকাল বা সন্ধ্যায় প্রধান খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় খাবার পাত্রে ফেলে না রেখে অল্প অল্প করে বারবার তাজা খাবার দেওয়া উচিত।
যেসব ভুল প্রাণীর জন্য বিপজ্জনকগরমের সময় কিছু সাধারণ ভুল প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে বলে সতর্ক করেন এই চিকিৎসক। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল হলো রোদে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে প্রাণীকে রেখে যাওয়া। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
এছাড়া দুপুরের কড়া রোদে বা উত্তপ্ত পিচঢালা রাস্তায় প্রাণীকে হাঁটানোও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে তাদের থাবা পুড়ে যেতে পারে এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই এমন ঘরে প্রাণীকে আটকে রাখা, অসুস্থতার লক্ষণকে গুরুত্ব না দেওয়া কিংবা আরাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত লোম কেটে ফেলাও ক্ষতিকর হতে পারে।
ডা. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘অনেকে মনে করেন সব লোম কেটে দিলে প্রাণী আরাম পাবে। কিন্তু অনেক প্রাণীর লোম সূর্যের তাপ ও সানবার্ন থেকে সুরক্ষা দেয়। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোম কাটা ঠিক নয়।’
পথপ্রাণীদের প্রতিও হোক সহমর্মিতাগরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে পথপ্রাণীরা। তাদের জন্য সামান্য উদ্যোগও অনেক বড় সহায়তা হতে পারে।
বাড়ির সামনে, দোকানের পাশে কিংবা ছায়াযুক্ত স্থানে পানিভর্তি একটি পাত্র রাখা যেতে পারে। এতে কুকুর, বিড়াল ও পাখিরা পানি পান করতে পারবে।
তীব্র গরমে কোনো প্রাণী যদি বারান্দা বা ছায়াযুক্ত স্থানে আশ্রয় নেয়, তাহলে তাকে তাড়িয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানান ডা. নাজিম উদ্দিন। সম্ভব হলে কিছু খাবারের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
কোনো প্রাণী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় প্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সচেতনতাই পারে প্রাণ বাঁচাতেপ্রচণ্ড গরমের এই সময়ে প্রাণীদের প্রতি সহমর্মী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রাণীরা তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। তাই তাদের প্রয়োজন বুঝে যত্ন নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
তার মতে, পোষা প্রাণীদের ঘরের সবচেয়ে ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে রাখা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয়।
তাপপ্রবাহের এই সময়ে মানুষের পাশাপাশি প্রাণীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটু সচেতনতা, সামান্য যত্ন এবং কিছু মানবিক উদ্যোগই বাঁচিয়ে দিতে পারে অসংখ্য প্রাণের জীবন।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
কেএসকে