লাইফস্টাইল

প্রিয় দলের হার নিয়ে ট্রল, কখন তা মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, অনেকের কাছে এটি আবেগ, পরিচয় এবং ভালোবাসার প্রতীক। বিশ্বকাপ বা বড় কোনো টুর্নামেন্ট এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় প্রিয় দলের সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে। কিন্তু সেই আনন্দের ছবিটা বদলে যায় দল হেরে গেলে।

Advertisement

বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা ইংল্যান্ডের মতো জনপ্রিয় দল হারার পর শুরু হয় ট্রলের বন্যা। বন্ধুরা একে অপরকে মজা করে, মিম বানায়, খোঁচা দেয়। সীমিত পরিসরে এগুলো অনেক সময় নিছক হাসি-ঠাট্টাই থাকে। কিন্তু যখন সেই ট্রল ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা ধারাবাহিক বিদ্রূপে পরিণত হয়, তখন তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মিম, ভিডিও ও ট্রল ছড়িয়ে পড়ে। এগুলোর অনেকই সৃজনশীল ও হাস্যরসাত্মক। খেলাধুলার সংস্কৃতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে হালকা খোঁচাখুঁচি নতুন কিছু নয়। বরং এটি অনেক সময় খেলার উত্তেজনাকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ট্রলের উদ্দেশ্য আর মজা থাকে না বরং কাউকে ছোট করা, অপমান করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া হয়ে ওঠে।

Advertisement

কখন ট্রল মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়?

একবার-দুবার মজা করা আর দিনের পর দিন একই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বিদ্রূপ করা এক বিষয় নয়। কেউ যদি বারবার অপমানজনক মন্তব্য করেন, কটু ভাষা ব্যবহার করেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন বা দল সমর্থনের কারণে কাউকে হেয় করেন, তাহলে সেটি আর নিরীহ ট্রল থাকে না।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য বারবার চোখে পড়লে অনেকেই মানসিক চাপে ভুগতে শুরু করেন। কেউ কেউ নিজের মত প্রকাশ করতেই ভয় পান, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে দেন।

যখন বেশি প্রভাব পড়ে

অনেকের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বরং শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ। তাই প্রিয় দল হারলে এমনিতেই মন খারাপ হয়। এর সঙ্গে যদি আশপাশের মানুষ বা অনলাইন ব্যবহারকারীদের ধারাবাহিক ট্রল যোগ হয়, তাহলে সেই হতাশা আরও বেড়ে যেতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ যখন কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে যুক্ত মনে করে, তখন সেই গোষ্ঠীকে নিয়ে উপহাস ব্যক্তিগত অপমান বলেই অনুভূত হতে পারে। তাই একই মন্তব্য একজনের কাছে হাসির হলেও আরেকজনের কাছে কষ্টের কারণ হতে পারে।

Advertisement

শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি

কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় খেলাকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখে। ফলে প্রিয় দল হারার পর বন্ধুদের ট্রল তাদের আত্মসম্মানে আঘাত করতে পারে। কেউ কেউ রাগ, হতাশা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিতেও ভুগতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানকে বোঝানো যে, খেলাধুলার মূল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও আনন্দে, শত্রুতা বা বিদ্বেষে নয়।

সুস্থ সমর্থক হওয়ার অর্থ কী?

খেলার আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন জয়ের উল্লাস যেমন উদযাপন করা যায়, তেমনি পরাজয়ও সম্মানের সঙ্গে মেনে নেওয়া যায়। প্রতিপক্ষকে সম্মান করা এবং নিজের দলের হারকে খেলাধুলার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা একজন পরিণত সমর্থকের পরিচয়।

একইভাবে মজা করার সময়ও মনে রাখা প্রয়োজন, অন্যের অনুভূতিকে আঘাত করা যেন উদ্দেশ্য না হয়। একটি মিম বা মন্তব্য যদি কাউকে অপমানিত, বিব্রত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে, তাহলে সেটি আর বিনোদন থাকে না।

আরও পড়ুন টেক্সাসে কাউবয় সেজে যা করলেন আর্লিং হালান্ড ট্রলের শিকার হলে যা করবেন

যদি কোনো ট্রল আপনার মানসিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রতিটি মন্তব্যের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিউট, ব্লক বা রিপোর্টের মতো ফিচার ব্যবহার করুন। কিছু সময়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বিরতি নিলেও মানসিক চাপ কমতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মনে রাখতে হবে ফুটবল একটি খেলা। একটি ম্যাচের ফলাফল আপনার ব্যক্তিত্ব, মূল্য বা পরিচয় নির্ধারণ করে না।

আরও পড়ুন ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার ফাঁকে সন্তানকে যেসব বিষয় শেখাতে পারেন

ফুটবল মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার শক্তি রাখে। একসঙ্গে খেলা দেখা, আলোচনা করা, আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই খেলাধুলার সৌন্দর্য। তাই ট্রল যদি হাসি এনে দেয়, সেটি উপভোগ করা যায়। কিন্তু যদি তা কাউকে অপমান, হেনস্তা বা মানসিকভাবে আঘাত করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে সেখানে সীমা টানা জরুরি। সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া

এসএকেওয়াই