আন্তর্জাতিক

সোনা কেনার আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি

সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে হাজার বছর ধরে টিকে রয়েছে মূল্যবান ধাতু সোনা। বিয়ে হোক কিংবা বিনিয়োগ, মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এটি। তবে আধুনিক যুগে সোনা কেনার সময় ‘ক্যারেট’, ‘হলমার্ক’ বা ‘খাদ’—এই শব্দগুলো বেশ ভাবায় সবাইকে।

Advertisement

সোনার বিশুদ্ধতা মাপার আন্তর্জাতিক একক হলো ক্যারেট। বিশুদ্ধতার মাত্রা অনুযায়ী ২৪, ২২, ২১ এবং ১৮ ক্যারেটে সোনাকে ভাগ করা হয়। ২৪ ক্যারেট সব থেকে খাঁটি সোনা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ২২ ক্যারেট বা তার কম ক্যারেটের সোনাই দৈনন্দিন জীবনে ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয়।

তাহলে কি ভেজাল সোনা কিনছেন সবাই? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সোনার তৈরি প্রক্রিয়ার ভেতরেই।

আরও পড়ুন ধারণার চেয়েও কমে যেতে পারে সোনার দাম, বলছে পূর্বাভাস সোনার ক্যারেট বলতে কী বোঝায়?

ক্যারেট বলতে মূলত সোনার বিশুদ্ধতা বা মান বোঝায়। সোনার অলংকারে কতটুকু খাঁটি সোনা আছে এবং কতটুকু অন্য ধাতু মেশানো হয়েছে, তা এই ক্যারেট দিয়ে পরিমাপ করা হয়।

Advertisement

সাধারণত অত্যন্ত নরম খনিজ পদার্থ হিসেবে খনি থেকে সোনা উত্তোলন করা হয়। তাই এটি দিয়ে সাধারণত গহনা তৈরি করা যায় না। এটি কয়েন বা বিস্কুট আকারে সংরক্ষণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই বেশি ব্যবহার হয়। খনি থেকে উত্তোলনের পর প্রায় শতভাগ খাঁটি নরম এই সোনাই ২৪ ক্যারেট হিসেবে পরিচিত। এতে অন্য কোনো ধাতু মেশানো থাকে না।

পরবর্তীতে এই সোনা দিয়ে গহনা তৈরি বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য এতে তামা, রুপা, দস্তা বা নিকেলের মতো ধাতু মিশিয়ে শক্ত করা হয়, যা ‘খাদ’ হিসেবে পরিচিত। এক্ষেত্রে খাদ যত বেশি মেশানো হবে, সোনার বিশুদ্ধতা তত কমবে। একই সঙ্গে সোনার ক্যারেটও তত নিচে নামবে।

আরও পড়ুন সোনা কেন কিনে রাখবেন? কোন ক্যারেটের কাজ কী?

বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে ২৪ ক্যারেটের পরই ২২ ক্যারেট। সোনা ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশে গহনা তৈরির জন্য ২২ ক্যারেটই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এই ক্যারেটের সোনা ৯১ দশমিক ৬৭ শতাংশ খাঁটি। মূলত টেকসই গহনা বানানোর জন্যই নরম সোনার সঙ্গে তামা, রুপা বা দস্তার মতো অন্য ধাতু মেশানো হয়। চুড়ি, কানের দুল, নাকফুল থেকে শুরু করে অধিকাংশ গহনাই এই ক্যারেটে তৈরি হয়।

বাংলাদেশে ২১ ক্যারেট সোনাও বেশ প্রচলিত। আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, এ ধরনের সোনা ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ খাঁটি। এটি ২২ ক্যারেটের চেয়েও অনেক বেশি শক্ত এবং টেকসই। নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য যেসব গহনা, যেমন—আংটি, চেইন, ব্রেসলেট বা কানের দুল তৈরিতে ২১ ক্যারেট সোনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অনেক সময় সূক্ষ্ম ডিজাইনের গহনার জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়।

Advertisement

এছাড়া ৭৫ শতাংশ সোনা এবং বাকি ২৫ শতাংশ অন্য ধাতু মিলে তৈরি হয় ১৮ ক্যারেট সোনা। হীরা বা অন্যান্য দামি পাথরের সঙ্গে সেট করার জন্য এটি সবচেয়ে উপযুক্ত। কারণ এই ক্যারেটের সোনা অনেক বেশি শক্ত হয় এবং পাথরকে মজবুতভাবে ধরে রাখতে পারে।

আরও পড়ুন সোনা-রুপার দামে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতন দেখা যাচ্ছে? খাঁটি সোনা চিনবেন কীভাবে?

খাঁটি সোনা চেনার সব থেকে সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপায় হচ্ছে হলমার্ক টেস্ট। হলমার্ক হচ্ছে অলংকারের গায়ে খোদাই করে চিহ্নিত নির্দিষ্ট সংখ্যা, যা সোনার গুণগত মান সম্পর্কে ধারণা দেয়।

আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, হলমার্ক সংখ্যা হিসেবে ২৪ ক্যারেট সোনার জন্য ৯৯৯ দশমিক ৯, ২২ ক্যারেটের জন্য ৯১৬, ২১ ক্যারেটের জন্য ৮৭৫ এবং ১৮ ক্যারেটের জন্য ৭৫০ সংখ্যা ব্যবহার হয়। এই সংখ্যাগুলো নির্দিষ্ট ক্যারেটের পরিচয় হিসেবে গহনার গায়ে খোদাই করে লেখা থাকে। গহনা কেনার সময় ক্যারেট অনুযায়ী গহনার গায়ে থাকা হলমার্ক সিল দেখে নেওয়া জরুরি।

এছাড়া সোনার আসল-নকল যাচাইয়ে নাইট্রিক এসিড টেস্ট, চুম্বক পরীক্ষা, পানির পরীক্ষা এবং সিরামিক প্লেট টেস্টের মতো কিছু প্রচলিত পদ্ধতিও রয়েছে।

হলমার্ক করার পাশাপাশি ‘কেডিএম সোনা’ নামেও এক ধরনের সোনার প্রচলন রয়েছে, যেখানে নরম সোনাকে গহনা তৈরির উপযোগী করতে ক্যাডমিয়াম নামের ধাতু মেশানো হয়। তবে এটি কারিগর ও ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় বর্তমানে সোনায় ক্যাডমিয়াম মেশানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আরও পড়ুন সোনার দামে রেকর্ড পতন, এই সুযোগ থাকবে কতদিন? সোনা পরিমাপের হিসাব ও জটিলতা

গত কয়েক বছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী সোনার বাজার। অস্থির সোনার বাজারে দাম ওঠানামা করছে অনেক বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে সোনার দাম নির্ধারণ এবং এর একক সম্পর্কেও ধারণা রাখা জরুরি। কারণ সোনার ওজন মাপার আন্তর্জাতিক একক এবং বাংলাদেশে প্রচলিত এককের কারণে সঠিক দাম বুঝতে অনেক সময় জটিলতা তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে সোনা, রুপাসহ এ ধরনের দামি ধাতুর ওজন মাপার জন্য ‘ট্রয় আউন্স’ একক ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ আউন্স এককের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এক আউন্স সমান ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম হলেও, এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০ গ্রাম।

অবশ্য বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সোনার ওজনের ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় ওজন পরিমাপের একক ‘ভরি’ শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত। সংখ্যার হিসাবে, এক ভরি সমান ১১ দশমিক ৬৬ গ্রাম এবং ২ দশমিক ৪৩ ভরিতে এক ট্রয় আউন্স হয়। এছাড়া ৮ রতিতে এক আনা এবং ১৬ আনায় এক ভরি হিসাব করা হয়।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) প্রতিদিন দেশের সোনার বাজারে যে দাম নির্ধারণ করে, সেটি মূলত গ্রাম হিসেবেই করা হয়। আগের প্রজন্ম ভরির হিসাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও বর্তমান সময়ে আধুনিক ব্যবসায়ীরা গ্রামের হিসাবেই কেনাবেচা করেন। সোনার ওজন হিসাবের জন্য ‘গ্রাম’ হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, তাই গ্রাম ব্যবহার করাই বেশি নির্ভুল।

সূত্র: বিবিসি বাংলাকেএএ/