জাতীয়

জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি নিষ্কাশনে রাতেও সড়কে সেনাবাহিনী

টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসন ও দ্রুত পানি নিষ্কাশনে দিন-রাত কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

Advertisement

সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার রাতেও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন খাল, নালা, কালভার্ট ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে কাজ করতে দেখা গেছে।

সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় গঠিত ১৬টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক মাঠে রয়েছে। প্রতিটি দলে প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, জুনিয়র কমিশন্ড কর্মকর্তা (জেসিও), সৈনিক ও সুপারভাইজারসহ ছয়জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত শ্রমিকও যুক্ত করা হচ্ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৃষ্টি চলাকালীন এবং বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরপরই কোথাও পানি জমে থাকলে দ্রুত তা অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খাল, নালা ও ড্রেনে জমে থাকা মাটি ও আবর্জনা সরিয়ে পানির প্রবাহ সচল রাখতে কাজ করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পুরো কার্যক্রম একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল সেল) থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সমন্বয়ের জন্য রয়েছে পৃথক একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও।

Advertisement

আরও পড়ুন চট্টগ্রামসহ ১৬ জেলায় বন্যার আভাস, এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ‌উদ্বেগ

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ছয়টি খালের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন অবকাঠামোগত ও আইনি প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জলাবদ্ধতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রকল্পের সব কাজ শেষ হলে নগরের জলাবদ্ধতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে আসবে।

মঙ্গলবার চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, শুধু দিনের বেলায় নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী রাতেও কাজ অব্যাহত রাখা হচ্ছে, যাতে পানি দীর্ঘ সময় সড়কে জমে না থাকে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানো যায়।

Advertisement

এদিকে, চট্টগ্রামে টানা বর্ষণে আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, হালিশহর, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নামাতে সেনাবাহিনী ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মীদের যৌথভাবে কাজ করতে দেখা গেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ এরই মধ্যে শতভাগ শেষ হয়েছে। বাকি খালগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ। তাদের দাবি, প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।

তবে তারা বলেন, অবৈধ দখল, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, দীর্ঘ বর্ষাকাল, জোয়ারের প্রভাব এবং আদালতের স্থগিতাদেশের মতো নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এরপরও বর্ষাকালে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন চট্টগ্রাম / সড়ক-নালা-ড্রেন একাকার, জলাবদ্ধ সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে ৫ হাজার ৪৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার কাজ। অবশিষ্ট অর্থ ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণে ব্যয় করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫৯১ দশমিক ৮৮ কাঠা জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ১৬২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল, ১১৫টি সেতু ও কালভার্ট, ছয়টি টাইডাল রেগুলেটর, ২১টি সিল্ট ট্র্যাপ, ২৩ দশমিক ২০ কিলোমিটার নতুন সাইড ড্রেন, ৪৪ দশমিক ১৪ কিলোমিটার বিদ্যমান ড্রেন সম্প্রসারণ এবং ৩৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার আরসিসি ও বিটুমিনাস সড়ক নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। জামালখান, মহেশখাল, নোয়া খাল, রামপুর খাল ও চাক্তাই ডাইভারশন খালের কাজ ৯৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। হিজড়া খালের কাজের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। সেখানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

১৩৭টি স্থাপনার মধ্যে ১২০টি অপসারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৭টি ভবন অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে। হিজড়া খালের বাকি কাজ আগামী সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালে ১১৩টি স্থানে ৩৫ থেকে ৩৬ ঘণ্টা জলাবদ্ধতা থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৬২টি স্থানে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টায় নেমে আসে। ২০২৫ সালে জলাবদ্ধতার স্থান কমে দাঁড়ায় ১৭টিতে এবং পানি নেমে যেতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। বর্তমানে মাত্র তিন থেকে চারটি স্থানে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পানি জমে থাকে।

তারা বলেন, কাতালগঞ্জের জাতিসংঘ পার্ক এলাকা উঁচু করা হয়েছে। নবপণ্ডিত বৌদ্ধ বিহার এলাকায় পাম্প স্থাপন ও রেগুলেটর উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ওই এলাকার সড়ক উঁচু করার কাজ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গত এপ্রিল মাসে এক মাসব্যাপী ৩৬টি খাল পরিষ্কার করা হয়েছে। খালের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেনগুলোও পরিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন পরিষ্কারের কাজ করেছে।

আরও পড়ুন ৪২ বছরের রেকর্ড বৃষ্টি, জলাবদ্ধতায় কার্যত অচল চট্টগ্রাম

প্রকল্পের আওতায় ১৬টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, জুনিয়র কমিশন্ড কর্মকর্তা (জেসিও), সৈনিক ও সুপারভাইজারসহ ছয়জন সদস্য রয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী আট থেকে ১০ জন শ্রমিকও যুক্ত থাকেন। একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে এসব দলের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ভূমি অধিগ্রহণ, দীর্ঘ বর্ষাকাল, আদালতের স্থগিতাদেশ, জোয়ারের পানি, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রেখে নির্মাণকাজ চালানো, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খাল প্রশস্ত করতে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, ভারী যন্ত্রপাতি প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত রাস্তার অভাব, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে প্রয়োজনীয় কর্মপরিসরের সংকট এবং খাল থেকে তোলা মাটি সংরক্ষণের জায়গার অভাব।

প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্ম‌দ মহসিনুল হক চৌধুরী, পিএসসি জাগো নিউজকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষাকালে খাল-নালায় ময়লা না ফেলার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রয়োজন।

তিনি চট্টগ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ হলে নগরের জলাবদ্ধতা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ, জলাবদ্ধতা ৭০–৮০ শতাংশ কমবে।

এমআরএএইচ/এমকেআর