জাতীয়

সব ধরনের সয়াবিন তেলেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড উভয় ধরনের সয়াবিন তেলেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড এনালাইসিসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা ব্র্যান্ডেড তেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

Advertisement

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেকের নেতৃত্বে একদল গবেষক ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এটি বাংলাদেশে সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলে দাবি করা হয়েছে। গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে সংগ্রহ করা তিনটি ব্র্যান্ডেড এবং তিনটি নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। নমুনাগুলোতে সলভেন্ট ডাইলিউশন, স্টেরিও মাইক্রোস্কোপ, ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কপি (FTIR) এবং স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ (SEM) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা চালানো হয়।

গবেষণায় প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি (±১০ হাজার ৫১০) মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নন-ব্র্যান্ডেড তেলে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি এবং ব্র্যান্ডেড তেলে ৪৮ হাজার ৬৭টি কণা শনাক্ত হয়েছে। পরিসংখ্যানগতভাবে এই পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ।

Advertisement

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা আঁশ জাতীয়। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা, যা মোট কণার প্রায় ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। রঙের দিক থেকে স্বচ্ছ কণার আধিক্য ছিল, যা মোট কণার ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এফটিআইআর বিশ্লেষণে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হলো- লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিইউরেথেন (PU) এবং নাইলন।

আরও পড়ুন ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমে, ক্ষতির বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই’

গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে প্রথমবারের মতো পলিইউরেথেন (PU) ও নাইলনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ব্র্যান্ডেড তেলের দূষণের উৎস মূলত উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্যদিকে নন-ব্র্যান্ডেড তেলের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে মোটা কণার দূষণ বেশি পাওয়া গেছে, যা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

Advertisement

স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে গবেষকেরা হিসাব করেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেল থেকেই প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরও বেশি-প্রতিদিন ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা। সারাজীবনে একজন প্রাপ্তবয়স্কের দেহে প্রায় ৪ লাখ ৭৭ হাজার এবং একজন শিশুর ক্ষেত্রে ২০ লাখেরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।

তবে, গবেষকেরা বলেছেন, দূষণের মাত্রা মাঝারি হলেও সামগ্রিক দূষণঝুঁকি বর্তমানে কম। তবুও ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়ার আগেই ভোজ্যতেলের উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত পরীক্ষা চালুর সুপারিশ করেছেন তারা।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ রান্নায় সয়াবিন তেল ব্যবহার করেন। তাই ভোজ্যতেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এদিকে, নিরাপদ খাদ্য বিশ্লেষক মাহবুবুর কবির মিলন বলেছেন, সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে উঠে আসছে। সয়াবিন তেলের পাশাপাশি সরিষা, রাইস ব্র্যান, পাম ও সূর্যমুখী তেলসহ অন্যান্য ভোজ্যতেলেও একই ধরনের পরীক্ষা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্র্যান্ডেড ও খোলা সয়াবিন তেল, তরল দুধ, কাঁচা দুধ, বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য এবং গুঁড়ো দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এসব গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারে থাকা অন্যান্য খাদ্যপণ্যও নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।

তার মতে, এসব পরীক্ষা ও নজরদারির দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই)। তবে খাদ্যে উদীয়মান দূষক (emerging contaminants) শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

মাহবুবুর কবির মিলন আরও বলেন, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়ে আদালত ও সরকারের নির্দেশনা থাকলেও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন দূষক শনাক্তে সমন্বিত উদ্যোগ, বিস্তৃত গবেষণা এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের উদ্যোগও জরুরি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, একজন মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খাবার খান। ফলে বিভিন্ন খাদ্য থেকে অল্প অল্প করে দূষক শরীরে প্রবেশের সম্মিলিত প্রভাব (cumulative exposure) মূল্যায়নে আরও গবেষণা ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

এএমএ