রাঙ্গামাটির ২৯৪ মিটার দীর্ঘ আসামবস্তি সেতু নির্মাণের মাত্র দুই দশকেই পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। পিলারের পাথর খসে বেরিয়ে পড়েছে মরিচা ধরা রড। সেতুর জরাজীর্ণ অবস্থা মেরামতে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘রেট্রোফিটিং’ বা আয়ু বাড়ানোর অন্তিম চেষ্টা করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
Advertisement
মাত্র দুই দশক আগেই, রাঙ্গামাটির আসামবস্তি এলাকা হয়ে কাপ্তাই হ্রদের উপর খাপ্পোপাড়া-কাপ্তাই সংযোগ সড়কের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ২০০৬ সালে নির্মিত হয় এ সেতুটি। মাত্র দুই দশক পার হওয়ার আগেই লাইফ সাপোর্টে রয়েছে, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আসামবস্তি সেতুটি। সেতুর ১৯ জোড়া পিলার ও বেজের পলেস্তারা খসে বের হয়ে গেছে পাথর। এ মরণফাঁদ রোধে এবং সেতুর আয়ু বাড়াতে এলজিইডি অন্তিম চেষ্টা হিসেবে ‘রেট্রোফিটিং’ স্থাপনের কাজ করছে।
রাঙ্গামাটি শহর থেকে এই সেতু দিয়ে আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়ক হয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী এবং পর্যটকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটির পিলারে হাত দিলেই এখন খসে পড়ছে পাথর। পিলারের জরাজীর্ণ দশা দেখে বোঝার উপায় নেই এর বয়স মাত্র দুই দশক। এই ঝুঁকি কাটাতে এখন চলছে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার ‘রেট্রোফিটিং’ বা সংস্কার কাজ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ‘২০০৬ সালে যখন কাজ শেষ করে সেতুটি বুঝে নেওয়া হলো, তখন কর্মকর্তারা সঠিকভাবে বুঝে নিলে আজ এ অবস্থা হতো না। ঠিকাদার যদি মানসম্মত কাজ করতো আর সঠিক মনিটরিং হতো, তবে ২০ বছরেই এই রাষ্ট্রীয় অর্থে অপচয় দেখতে হতো না। এখন নতুন করে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকায় ‘রেট্রোফিটিং’ বা আয়ু বাড়ানোর কাজ করছে এলজিইডি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, নির্মাণের সময় কি তবে কোনো ফাঁক ছিল? এটা কি অনিয়মরে ক্ষত নাকি অন্যকিছু?’
Advertisement
রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাবের সভাপতি আনোয়ার আল হক বলেন, ‘সাধারণত আমরা দেখি একটি সেতু ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। আর এ সেতুটির মাত্র ২০ বছরেই করুণ দশা। এটির সংস্কার কাজ করার আগে কোনো কি তদন্ত হয়েছে। যারা এর জন্য দায়ী তাদের কি বিচার হবে না?’
রাঙ্গামাটি দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, ‘দুই দশক পরে ‘রেট্রোফিটিং’ নামে সরকারের এত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছু না। নির্মাণকালে মানসম্পন্ন সামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত, সঠিক মনিটরিং করা হলে, সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রের এত টাকা অপচয় হতো না।’
এলজিইডি রাঙ্গামাটি কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০০৩ সালে শুরু হয়, যা ২০০৬ সালে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তবে তৎকালীন নির্মাণ ব্যয় সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি এলজিইডি। রেট্রোফিটিং প্রযুক্তি হয়ত সেতুর আয়ু বাড়াবে, কিন্তু নির্মাণের সময় অনিয়ম আর অবহেলার যে ক্ষত ফুটে উঠেছে, তার স্থায়ী প্রতিকার কী হবে? সেই প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।’
রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা প্রকৌশলী প্রণব রায় চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণত এত তাড়াতাড়ি বড় সমস্যা হওয়ার কথা না। তবুও যখন আমাদের চোখে সমস্যা ধরা পড়েছে আমরা দ্রুত এটিকে নিরাপদ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’
Advertisement
সেতু নির্মাণের সময়ে গুণগতমান বজায় না রাখা, জলবায়ুর প্রভাব ও পানির ওপর দায় চাপালেন এলজিইডি রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী আহাম্মেদ শফি। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্ট্রাকচারগুলো খুব দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া ডিজাইনের সময় পার্মানেন্ট কেজিং দেওয়ার কথা হয়ত মাথায় রাখা হয়নি। এখানে একক কাউকে দোষারোপ করা কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের পানিতে সেতুটি বছরের নয় মাস নিমজ্জিত থাকা সেতুর পিলারের এই ক্ষয়ের মূল কারণ। তবে নতুন করে সেতুটি বানাতে যেখানে ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হতো, সেখানে আধুনিক ‘রেট্রোফিটিং’ পদ্ধতিতে মাত্র পৌনে দুই কোটি টাকা খরচ করে এর আয়ু আরও ৩০ থেকে ৪০ বছর বাড়বে।’
আবু দারদা খান আরমান/কেজে/এএসএম