জিয়াউদ্দিন লিটন
Advertisement
সাহিত্য কোনো স্থির ও বিচ্ছিন্ন শিল্পরূপ নয়; সময়, সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের পরিবর্তিত জীবনবোধের সঙ্গে সাহিত্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি সমাজ যে সংকট, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তার প্রতিফলন কোনো না কোনোভাবে সাহিত্যে প্রকাশিত হয়। তাই সমকালীন বাংলা সাহিত্যকে কেবল কিছু সৃষ্টিশীল রচনার সমষ্টি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়; বরং এটিকে দেখতে হবে একটি পরিবর্তনশীল সমাজের আত্মপ্রকাশ হিসেবে।
একবিংশ শতকের বাংলা সাহিত্য এক জটিল রূপান্তরের সময় অতিক্রম করছে। একদিকে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য, ভাষার সৌন্দর্য, মানবিক মূল্যবোধ ও নান্দনিক উত্তরাধিকার; অন্যদিকে রয়েছে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, পরিবর্তিত পাঠাভ্যাস, বাজারব্যবস্থা, পরিচয়ের রাজনীতি, সামাজিক বিভাজন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন বাস্তবতা। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি বাংলা সাহিত্যকে যেমন নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়েছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নানা চ্যালেঞ্জ। সমকালীন বাংলা সাহিত্যকে বুঝতে হলে তাই শুধু সাহিত্যিক রীতির পরিবর্তন নয়, বরং এর পেছনে কাজ করা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বর্তমানে প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন পরিবর্তন করেছে, তেমনি সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও এনেছে নতুন মাত্রা। একসময় সাহিত্যপত্র, সংবাদপত্র ও মুদ্রিত বই ছিল সাহিত্য প্রকাশ ও পাঠের প্রধান মাধ্যম। উনিশ শতকে মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার বাংলা সাহিত্যকে নতুন গতি দিয়েছিল; সাহিত্যপত্র, সাময়িকী ও গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে লেখক ও পাঠকের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশ শতকেও মুদ্রিত বই ও সাহিত্যপত্রই ছিল সাহিত্যচর্চার প্রধান ভিত্তি।
Advertisement
একবিংশ শতকে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সাহিত্য প্রকাশের পরিসর ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ই-বুক, অনলাইন সাহিত্যপত্র, ব্লগ, ওয়েব ম্যাগাজিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন সাহিত্য প্রকাশ ও পাঠের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী পাঠক এখন একই সময়ে একই সাহিত্যকর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির একটি বড় প্রভাব হলো—এটি সাহিত্য প্রকাশের সুযোগকে আরও উন্মুক্ত করেছে। আগে নতুন লেখকদের জন্য সাহিত্যপত্রের সম্পাদকীয় নির্বাচন ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হতো; বর্তমানে অনেক লেখক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে নতুন লেখক, তরুণ কবি ও বিকল্প ধারার সাহিত্যিকদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন সাহিত্যচর্চা নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফেসবুক, ব্লগ ও অনলাইন সাহিত্যপত্রে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও সমালোচনা প্রকাশের মাধ্যমে পাঠক-লেখক সম্পর্কের ধরন বদলে গেছে। সাহিত্য এখন শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে একটি চলমান ডিজিটাল আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত পাঠের প্রবণতা, স্বল্পদৈর্ঘ্য লেখা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি কি গভীর মনোযোগী পাঠের অভ্যাসকে দুর্বল করছে? দীর্ঘ রচনা, জটিল ভাবনা ও গভীর সাহিত্য নির্মাণের জন্য যে ধৈর্য প্রয়োজন, দ্রুতগতির ডিজিটাল সংস্কৃতি কি সেখানে কোনো সংকট তৈরি করছে?
পাঠ-প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল পাঠ অনেক ক্ষেত্রে তথ্য গ্রহণকে দ্রুত ও সহজ করে তুললেও দীর্ঘ মনোযোগ ধরে রেখে পাঠ করার অভ্যাসের ক্ষেত্রে মুদ্রিত পাঠের সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের সাহিত্যচর্চায় ডিজিটাল মাধ্যমের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি গভীর পাঠ ও মননশীলতার চর্চাও বজায় রাখা প্রয়োজন।
Advertisement
সাহিত্য মূলত ধৈর্য, মনন, কল্পনা ও অনুভবের শিল্প। প্রযুক্তি সাহিত্যকে নতুন পাঠক ও নতুন প্রকাশভঙ্গি দিতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের গভীরতা, মানবিক অভিজ্ঞতা এবং নান্দনিক মূল্য নির্ভর করে লেখকের সৃজনশীলতা ও জীবনবোধের ওপর। তাই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সাহিত্যের মৌলিক সৌন্দর্য ও গভীরতা রক্ষা করাই সমকালীন লেখকের অন্যতম দায়িত্ব।
সমকালীন সাহিত্যে পরিচয়ের প্রশ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। নারী-অভিজ্ঞতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, প্রান্তিক মানুষের জীবন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, জাতিসত্তা—এসব বিষয় বর্তমান সাহিত্যে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। আধুনিক সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি শুধু ব্যক্তিমানসের অনুভূতি নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতাকেও প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করছে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও পরিচয় ও সমাজের প্রশ্ন নতুন নয়। ঊনবিংশ শতকের সমাজসংস্কার আন্দোলন, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বাংলা সাহিত্যকে মানুষের পরিচয়, অধিকার ও অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ শতকের পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে সাহিত্যিক অনুসন্ধান আরও গভীর হয়েছে।
বিশেষ করে সমকালীন সাহিত্যে নারীজীবনের অভিজ্ঞতা, নারীর আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও স্বাধীনতার প্রশ্ন নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। একইভাবে শ্রমজীবী মানুষ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-সংগ্রামও সাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করছে। এর ফলে বাংলা সাহিত্য আগের তুলনায় আরও বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন উপন্যাস এবং সিনেমায় হুমায়ূন আহমেদবর্তমানে বিশ্বায়ন, অভিবাসন ও প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে মানুষের পরিচয়ের ধারণাও পরিবর্তিত হচ্ছে। একজন মানুষ একই সঙ্গে স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এই বহুমাত্রিক পরিচয় সমকালীন কবিতা, গল্প ও উপন্যাসে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে এই ক্ষেত্রেও রয়েছে কিছু জটিলতা। সাহিত্য যেমন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ, তেমনি শিল্পীর স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখক বাস্তবতাকে কীভাবে দেখবেন, কোন ভাষায় প্রকাশ করবেন এবং কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলবেন—এটি সব সময়ই আলোচনার বিষয়।
সাহিত্যে কোনো সামাজিক বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু বক্তব্য নয়, শিল্পমান ও নান্দনিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত প্রচারণাধর্মিতা কখনো কখনো সাহিত্যিক গভীরতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন সাহিত্যও সময়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হারাতে পারে। তাই সামাজিক সংবেদনশীলতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করাই সমকালীন সাহিত্যের বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে সাহিত্যও অনেকাংশে বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রকাশনা শিল্প, পাঠকের রুচি, প্রচারব্যবস্থা এবং বিক্রয়নীতি সাহিত্য গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আধুনিক প্রকাশনা জগতে একটি বইয়ের সাফল্য এখন শুধু তার সাহিত্যিক গুণের ওপর নির্ভর করে না; প্রচ্ছদ, বিপণন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার, লেখকের জনপ্রিয়তা এবং পাঠকের প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রকাশনা শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকে মুদ্রণযন্ত্রের বিস্তার ও সাহিত্যপত্র প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা বইয়ের বাজার গড়ে উঠতে শুরু করে। পরে গ্রন্থমেলা, বিশেষ করে, বাংলা বইয়ের প্রকাশনা ও পাঠসংস্কৃতিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে অনলাইন বই বিক্রি, ডিজিটাল প্রকাশনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের কারণে সাহিত্যবাজারের ধরন আরও পরিবর্তিত হয়েছে।
এর ফলে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—সাহিত্যের মূল্য কি তার বাজারসাফল্যে নির্ধারিত হবে, নাকি তার শিল্পগুণ, গভীরতা ও মানবিক আবেদন দ্বারা? ইতিহাস প্রমাণ করে, অনেক সাহিত্যকর্ম প্রকাশের সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা না পেলেও পরে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আবার অনেক জনপ্রিয় রচনা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারেনি।
জনপ্রিয়তা সব সময় সাহিত্যের মান নির্ধারণ করে না। তবে পাঠকের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সাহিত্যও দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে না। কারণ সাহিত্য একদিকে যেমন শিল্পীর ব্যক্তিগত সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি সমাজ ও পাঠকের সঙ্গে একটি যোগাযোগের মাধ্যম।
বর্তমানে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো—সাহিত্য পণ্যের মতো বাজারে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। দ্রুত বিক্রয়যোগ্য বিষয়, জনপ্রিয় ধারার লেখা এবং প্রচারনির্ভর সাফল্য কখনো কখনো গভীর সাহিত্যিক মূল্যায়নের জায়গাকে আড়াল করতে পারে। এর ফলে সম্পাদক, সমালোচক ও গবেষকের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি সুস্থ সাহিত্য-পরিবেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে বাজারের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে না, আবার সাহিত্যকে শুধু বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করাও হবে না। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের সম্মিলিত দায়িত্ব হলো—মানসম্মত সাহিত্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সাহিত্যের শিল্পমূল্য, স্বাধীনতা ও মানবিক আবেদনকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
এটা অজানা নয় যে, ভাষা কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়; এটি একটি জীবন্ত সামাজিক সত্তা। মানুষের জীবনযাপন, চিন্তাধারা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষারও স্বাভাবিক রূপান্তর ঘটে। বাংলা ভাষার ইতিহাসেও এই পরিবর্তনের দীর্ঘ ধারা লক্ষ্য করা যায়। চর্যাপদের প্রাচীন বাংলা থেকে মধ্যযুগীয় কাব্যভাষা, ঊনবিংশ শতকের সাধু রীতি থেকে আধুনিক চলিত ভাষা—প্রতিটি পর্যায়েই বাংলা ভাষা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।
আরও পড়ুন সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা: মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণবর্তমানে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলা ভাষার পরিবর্তনের গতি আরও তীব্র হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদ, ব্লগ, ইউটিউব, ডিজিটাল প্রকাশনা এবং মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে নতুন ধরনের ভাষার ব্যবহার তৈরি হয়েছে। সংক্ষিপ্ত বাক্য, ইংরেজি শব্দের মিশ্রণ, ধ্বনিগত বানান, ইমোজি-নির্ভর প্রকাশভঙ্গি এবং কথ্যভাষার সরাসরি প্রয়োগ—এসব এখন দৈনন্দিন যোগাযোগের অংশ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভাষাচর্চায় এই নতুন প্রবণতা স্পষ্ট।
একদিকে এই পরিবর্তন বাংলা ভাষাকে আরও গতিশীল ও বহুমাত্রিক করছে। নতুন শব্দ, নতুন অভিব্যক্তি ও নতুন বাক্যগঠন ভাষার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগের ফলে বাংলা ভাষায় বহু নতুন পরিভাষা যুক্ত হয়েছে। প্রবাসী বাঙালিদের ভাষাচর্চাও বাংলা ভাষার নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে; বিভিন্ন দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বাংলা লেখালেখিতে নতুন বিষয় ও ভাষাভঙ্গি যোগ করছে।
অন্যদিকে এই পরিবর্তন সাহিত্যিক ভাষার ক্ষেত্রে কিছু সংকটও তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—সাহিত্যের ভাষা কি কেবল প্রমিত ব্যাকরণনির্ভর ও পরিশীলিত রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জীবন্ত কথ্যভাষা, আঞ্চলিক ভাষা ও নতুন ডিজিটাল ভাষার উপাদানও গ্রহণ করবে? ভাষার অতিরিক্ত সরলীকরণ, অসতর্ক বানানপ্রয়োগ, অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দের ব্যবহার এবং ভাষার শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রতি উদাসীনতা সাহিত্যিক মানের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায়, বড় সাহিত্যিকরা কখনোই ভাষাকে কৃত্রিমভাবে আটকে রাখেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় নতুন সংগীতধর্মিতা, স্বাভাবিকতা ও ভাবপ্রকাশের শক্তি যোগ করেছিলেন। প্রমথ চৌধুরী চলিত ভাষার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং বাংলা গদ্যকে আরও স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত করেন। কাজী নজরুল ইসলাম আরবি-ফারসি-দেশজ শব্দসহ নানা ভাষার উপাদান গ্রহণ করে বাংলা কাব্যভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে ভাষার বিকাশ ঘটে গ্রহণ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে।
তবে সাহিত্যিক ভাষার মূল শক্তি শুধু শব্দ ব্যবহারে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ভাবের গভীরতা, প্রকাশের সৌন্দর্য, ছন্দ, ধ্বনি, ব্যঞ্জনা ও নান্দনিকতা। কথ্যভাষা সাহিত্যে স্থান পেতে পারে, কিন্তু তা শিল্পরূপ লাভ করার জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল রূপান্তর। আঞ্চলিক ভাষা বা সামাজিক কথ্যরীতি সরাসরি তুলে দিলেই সাহিত্য সৃষ্টি হয় না; লেখকের শিল্পদৃষ্টি তাকে সাহিত্যিক মর্যাদা দেয়।
বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সামনে তাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—পরিবর্তনশীল ভাষাকে গ্রহণ করা, কিন্তু ভাষার সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রাখা। প্রমিত ভাষা কোনো বন্ধ দরজা নয়; এটি একটি বিকশিত কাঠামো। জীবন্ত ভাষার প্রবাহ, নতুন অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে সমন্বয় করেই বাংলা সাহিত্য ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে।
সুতরাং ভাষার পরিবর্তনকে সংকট হিসেবে না দেখে একটি স্বাভাবিক বিবর্তন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তবে এই বিবর্তন যেন ভাষার গভীরতা, শৈল্পিকতা ও ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে—সেদিকেই সাহিত্যিকদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কবি ও সম্পাদক।
আরও পড়ুন উদয় রহমানের গল্প: অতিলৌকিকতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্বএসইউ