ফিচার

সুন্দরবনের মানুষ বাঘকে কী কী নামে ডাকে জানেন?

বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদায় বীরত্বের প্রতীক। অরণ্যের ভয়ংকর সুন্দর এ প্রাণীটির সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক রকম বাঘ রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের বাঘের মতো এতো সুন্দর, শক্তিবান, দর্পশালী, ভীমমূর্তি এবং পটু বন্যজন্তু আর কোথাও নেই।

Advertisement

বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী। বাঘ বলতেই মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয়রা বাঘকে ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ নামে অভিহিত করেছিলেন। বাঘের হিংস্রতা ও শক্তির কারণে জেলে, বাওয়ালী ও অন্যান্য প্রাণী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষ ও সুন্দরবনে জীবিকা অর্জনকারীরা বাদাবনে কেউ বাঘের নাম ‘বাঘ’ বলে না। কেউ কেউ বড় মামা, কেউ বড় মিয়া, গাজী, ঠাকুর প্রভৃতি নামে ডাকে। কেউবা ভীতিপূর্ণ নমস্কার ও পূজা করে থাকে।

এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া আর কোনো দেশে পাওয়া যায় না। বর্তমানে সারাবিশ্বে বাঘের সংখ্যা কমে ৩ হাজারেরও নিচে নেমে এসেছে। শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারই নয়, পৃথিবীর সব প্রজাতির বাঘই এখন আশংকাজনকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এ বিলুপ্তির হাত থেকে বাঘ বাঁচাতে প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হয়। এ বছরের (২০২৬ সালে) বিশ্ব বাঘ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘বাঘ করি সংরক্ষণ, সমৃদ্ধ হবে সুন্দরবন’।

আরও পড়ুন সাপ লাজুক প্রাণী: হত্যা করলে ৭ বছরের জেল-১০ লাখ টাকা জরিমানা

সৌন্দর্য, মর্যাদা আর শক্তিমত্তায় অতুলনীয় বাঘের আদিনিবাস বাংলাদেশের সুন্দরবন, ভারত, মিয়ানমার, সাইবেরিয়া অঞ্চল, সুমাত্রা এবং জাভা। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারে বাঘ রয়েছে। হিমালয়ের মতো সুউচ্চ ও হিমশীতল বৈরী পরিবেশেও এরা চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

Advertisement

পুরুষ বাঘের দৈর্ঘ্য মাথা থেকে লেজসহ সাড়ে ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ভেতর লেজের দৈর্ঘ্য ৮৫ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার হতে পারে। গড় ওজন ২০০ থেকে ২৩৬ কেজি। তবে এ যাবৎ সবচেয়ে বড় বাঘের ওজন ৩৮৮.৭ কেজি পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। স্ত্রী বাঘ আকারে ছোট হয়। দৈর্ঘ্য ৩ মিটারের কিছু বেশি হতে পারে। বাঘের পায়ের ছাপ গোলাকৃতির আর বাঘিনীর ছাপ লম্বাটে হয়। বাঘের সারা শরীর হলুদ-কমলা-বাদামি এবং সাদা-কালো লম্বাটে ডোরাকাটা ঢেউ খেলানো দাগ থাকে। প্রচন্ড শক্তিশালী এবং ভয়ংকর হিংস্র এই প্রাণীটি গভীর অরণ্যে নির্জনে থাকতে পছন্দ করে। এরা এক লাফে ৭-৮ মিটার অতিক্রম করতে পারে এবং সাড়ে ৩ মিটার উঁচুতে উঠতে পারে। এরা ভালো সাঁতার কাটতে পারে এবং গাছে চড়ায়ও বেশ পারদর্শী।

মাংসাশী এ প্রাণীটির খাদ্য তালিকায় রয়েছে হরিণ, শূকর, বনগরু, গয়াল, নীলগাই, হাতি বা গন্ডারের বাচ্চা, মহিষ, কুমির, অজগর এমনকি সুন্দরবনের বাঘরা মাছও খায়। বাঘ প্রতি সপ্তাহে একবার শিকার করে। তবে শিকারের ওজন ৩০-৪০ কেজির কম হলে আবার শিকারের জন্য বের হতে হয়। প্রতিদিন এদের গড়ে ৭ কেজি খাদ্যের প্রয়োজন। সে হিসাবে এর খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে দরকার প্রতি বছর গড়ে ৩ হাজার ৬৫০ কেজি মাংস। যার ওজন ৭৩টি চিত্রা হরিণের সমপরিমাণ। প্রায় সব প্রজাতির বাঘ প্রজননক্ষম হয় আড়াই থেকে ৩ বছর বয়সে। বাঘিনীর বাচ্চা ধারণের সময়সীমা ১০৮ দিন। বাঘিনী একসঙ্গে ২ থেকে ৬টি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করে। বাঘের জীবনকাল ১৪ থেকে ২০ বছর।

আরও পড়ুন আটার বস্তা থেকে পোশাক, মহামন্দায় যেভাবে বদলে যায় ফ্যাশন

সুন্দরবনে ২০১৮ সালে ১১৪টি বাঘ পাওয়া গিয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সালের জরিপে পাওয়া গেছে ১২৫টি। অর্থাৎ গত ছয় বছরে প্রায় ১০ শতাংশ বাঘ বেড়েছে সুন্দরবনে। প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব ২ দশমিক ৬৪টি। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সুন্দরবন বন বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৭৫ সালে একজন ইউরোপীয় বাঘ বিশেষজ্ঞ মি. হেন্ডরিস সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শুমারি করেন। ওই শুমারিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তখন সুন্দরবনে রয়েল বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৫০টি।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যে জানা যায়, ১৯৯১ সালে একটি বিদেশি সংস্থা সুন্দরবনে জরিপ চালিয়ে পায় বাঘের সংখ্যা ৪৫৯টি। এরপর ১৯৯৩ সালে নেপালের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. কেএম তামাং সুন্দরবনে শুমারি পরিচালনা করেন। ওই শুমারিতে পাওয়া হিসাবে তখন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৬২টি। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ টিসা ম্যাকগ্রেগর জানান, বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে ২০০টির বেশি বাঘ নেই। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির-৩ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাঘশুমারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাগ মার্ক (পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতিতে) এর শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে সুন্দরবন অংশে ৪১৯টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ১২১টি এবং স্ত্রী ২৯৮টি। আর বাচ্চার সংখ্যা ২১টি। ভারত অংশে রয়েছে ২৭৪টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ। এর মধ্যে পুরুষ ২৪৯টি ও স্ত্রী ২৫টি।

Advertisement

আরও পড়ুন সুন্দরবনের কেওড়া: উপকূলের নারীদের হাতে সম্ভাবনার নতুন অর্থনীতি

তবে বিশিষ্ট প্রাণীবিদ মনিরুল এইচ খানের মতে, ক্যামেরা ট্যাপিং পদ্ধতিতে নতুন বাঘশুমারিতে বাংলাদেশে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা পাওয়া গেছে ২০০টি এবং ভারতীয় অংশে ১০০ থেকে ১৫০টি। পায়ের ছাপ গণনা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে যে শুমারি করা হয় তাতে একই বাঘের একাধিক পায়ের ছাপ গণনায় চলে আসার আশংকা থাকে। ২০০৪ সালে পায়ের ছাপ গণনা বা পাগ মার্ক পদ্ধতিতেই বাঘশুমারি করা হয়েছিল। এ পরিসংখ্যান নিরুপণ করাও খুবই কঠিন। তবে বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বাঘ গণনা করা হচ্ছে। গত বছরের ২৩ মার্চ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে। এর আওতায় সুন্দরবনের বাঘ স্থানান্তর, অন্তত দুটি বাঘের শরীরে স্যাটেলাইট কলার স্থাপন ও পর্যবেক্ষণ, বাঘের পরজীবী সংক্রমণ ও অন্যান্য ব্যাধি এবং মাত্রা নির্ণয়, উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে।

এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, ‘আমাদের পুরো জরিপ চলতি বছরের আর্ন্তজাতিক বাঘ দিবসের (২৯ জুলাই) আগে শেষ হবে। ওই সময়ের মধ্যে আমরা জরিপের ফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করব।’ পরে জুলাইয়ে চলমান পরিস্থিতিতে তা আর প্রকাশ হয়নি। ২০০৪ সালে প্রথম বন বিভাগ ও আইইউসিএন যৌথভাবে সুন্দরবনে বাঘশুমারি করে। পায়ের ছাপ গুনে করা ওই জরিপে বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায় ৪৪০। পরে ২০১৫ সালে প্রথম ক্যামেরা ফাঁদ ব্যবহার করে বাঘের ছবি তুলে এবং পায়ের ছাপ গণনা করে সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে বাঘের ওপর জরিপ চালানো হয়। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বনভূমি ৪ হাজার ৮৩২ এবং জলাভূমি ১ হাজার ১৮৫ বর্গকিলোমিটার।

আরও পড়ুন জলবায়ুর অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

১৯৯৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই বনভূমির স্থলে ২৮৯ প্রজাতির প্রাণী আর জলে ২১৯ প্রজাতির প্রাণী বাস করে। ২০১৫ সালের বাঘশুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। আর ২০১৮ সালের শুমারিতে ছিল ১১৪টি। বাঘ জরিপ দলের অন্যতম সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজ বলেন, ‘জরিপ অনুযায়ী ১১৪টি বাঘ পাওয়া গেছে। তবে বনের আয়তন ও বাঘের খাবারের পরিমাণ বিবেচনায় নিলে ওই সংখ্যা ১৫০টিতে উন্নীত করা সম্ভব।

কেএসকে