কৃষি ও প্রকৃতি

অন্যের জমিতে কাজ করা সাঈদ এখন দৈনিক ২ হাজার কেজি ড্রাগন বিক্রি করেন

ড্রাগন ফল চাষ করে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হয়েছেন সাঈদ সরকার। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর গ্রামের এই তরুণ চাষাবাদের পাশাপাশি ফলের ব্যবসা ও চারা বিক্রি করেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। চাকরি ছেড়ে ড্রাগন ফল চাষ করে পেয়েছেন দুহাত ভরা সফলতা। চারা উৎপাদন, ফল বিক্রি ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে সফল উদ্যোক্তার পাশাপাশি সাঈদ সরকার এখন সফল ব্যবসায়ী। তবে সাঈদের এই যাত্রা প্রথমদিকে এতটা সহজ ছিল না। শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন চাচাতো ভাইয়ের জমিতে। চাকরি ছেড়ে কৃষিকাজ শুরু করায় শুনেছেন অনেকের কটুকথা। পরিচিত লোকজনের তাচ্ছিল্য, মশকরা ও কয়েক দফা লোকসান গুনেও ড্রাগনের আবাদ চালিয়ে গেছেন এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। তার উৎপাদিত ফল এখন সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন শহরে। এই ফল রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।

Advertisement

সরেজমিনে জানা গেছে, মহেশপুর উপজেলার গৌরীনাথপুর বাজারে ড্রাগন ফলের শতাধিক পাইকারি আড়ত আছে। এসব আড়তের মধ্যে অন্যতম সাঈদ সরকারের ফলের আড়ত। ২০২২ সালে প্রথম ‘আয়ান ফল ভান্ডার’ নামে ফলের আড়ত দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। পরে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আড়তের বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ায় তার সঙ্গে যুক্ত হন তার বড় ভাই। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আরও পড়ুন এক বাজারেই দৈনিক দেড় কোটি টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সাঈদ সরকার জাগো নিউজকে জানান, ২০২১ সাল পর্যন্ত একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় ভালো পদে চাকরি করতেন সাঈদ সরকার। কিন্তু দেশের বাজারে বিদেশি ফলের চাহিদা দিনদিন বাড়তে থাকায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত বিদেশি ফল আবাদ করার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই ভাবনা থেকে ২০২১ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। নিজের দেড় বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। একই সময় নিজের জমিতে কাজ করার পাশাপাশি চাচাতো ভাইয়ের জমিতেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন সাঈদ সরকার। ২০২২ সালের শেষদিকে গৌরীনাথপুর বাজারে ফলের আড়ত চালু করেন। নিজের বাগানের ফল বিক্রির পাশাপাশি অন্যান্য কৃষকদের কাছ থেকে ফল কিনে তা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ শুরু করেন।

আবু সাঈদ সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছি। দিনে চারশ টাকা মজুরি পেতাম। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলতো না। চাকরি ছেড়ে কৃষিকাজ শুরু করায় মানুষ আমাকে নিয়ে নানা রকম কথা বলেছে। আমি হাল ছাড়িনি। ২০২১ সালের অক্টোবরে ড্রাগন চাষ শুরুর পর থেকে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করি। ভ্যানে করে সেই সব চারা ঝিনাইদহ শহর, কালীগঞ্জ, যশোর, চুয়াডাঙ্গায় বিক্রি করতাম। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় ড্রাগনের চারা পাঠাতাম।’

Advertisement

আরও পড়ুন চাকরি না পেয়ে উদ্যোক্তা হলেন নাঈম, ড্রাগনেই বাজিমাত

তরুণ এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘ড্রাগনের চারা বিক্রি করতে গিয়ে অনেক সময় দিনশেষে লোকসান মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরতাম। কিন্তু হতাশ হইনি। এভাবে বছর দুয়েক অনেক কষ্ট করেছি। তারপর ফলের আড়ত চালু করলাম। বেচাকেনা বেড়ে গেল। আড়ত ও ফল বাগানের বিভিন্ন ধরনের ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে ছাড়তাম। ফেসবুকে আমার একটা পেজ ছিল। মানুষ আমার ভিডিও ফেসবুকে দেখে ড্রাগন ফলের চারা ও ফল কেনার অর্ডার করতো। এভাবেই আমার শুরু।’

সাঈদ সরকার বলেন, ‘এখন প্রায় ১২ বিঘা জমিতে আমার ড্রাগন ও পেয়ারার আবাদ রয়েছে। আমার দেওয়া চারা থেকে গাজীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লার নিমসার, খাগড়াছড়ি, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ড্রাগনের বাগান গড়ে উঠেছে। এখন আমার আড়তে গড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার কেজি ড্রাগন ফলের বেচাকেনা হয়। বাগানেও ড্রাগনের ফলন ভালো এসেছে।’

আরও পড়ুন শার্শায় কৃত্রিম আলোয় ড্রাগন চাষে তিনগুণ ফলন

আড়তের বেচাকেনা প্রসঙ্গে তরুণ এই কৃষি উদ্যোক্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে বেকার বলে কিছু নেই। মানুষ কখনো বেকার থাকে না। অল্প পুঁজি নিয়ে নিজের মতো করে কিছুর করার উদ্যোগ নিলেই তরুণরা সফল হতে পারে। শুরুটা কখনো বড় কিছু দিয়ে হয় না। ছোট কিছু দিয়ে, অল্প অল্প করে শুরু করতে হয়। এভাবে একদিন বড় হওয়া যায়।’

সাঈদ সরকার বলেন, ‘উদ্যোক্তা হলে বরং আরও মানুষের কাজের সুযোগ করে দেওয়া যায়। আমার আড়তে ও ফলের বাগানে অনেকেই এখন কাজ করেন। তাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। আমি মনে করি, কৃষি উদ্যোক্তা হওয়া আমার কাছে নিরাপদ ও গৌরবের। চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের নিজের মতো করে কিছু করা উচিত।’

Advertisement

এম শাহাজান/এসইউ