জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়া প্রতি বছর ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
Advertisement
একই সময়ে এ অঞ্চলে ২৮ কোটি নতুন কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় হুমকি হয়ে উঠছে বলে বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত ‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়ার সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
Advertisement
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারেন, যা বর্তমানে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার চারগুণ।
আরও পড়ুন তাপপ্রবাহে বাড়ছে এসির চাহিদা, বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্যবিশ্বব্যাংক জানায়, তীব্র তাপপ্রবাহ এরই মধ্যে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, বয়স্ক এবং শিশুদের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হলো এর শহরগুলো। কিন্তু ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
তিনি বলেন, তাপ-সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে সুরক্ষিত রাখার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করারও পূর্বশর্ত। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে দেশগুলো আরও সহনশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বসবাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পারবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
Advertisement
প্রতিবেদনটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখানো হয়েছে, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কীভাবে শ্রমিক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, জনসেবা এবং নগর অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
আরও পড়ুন ব্যাংক খাতের সংস্কারে ৪৫ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংকবিশ্বব্যাংকের মতে, তাপপ্রবাহকে আর কেবল মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো বিনিয়োগ, সরকারি নীতি এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে তাপ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, হিট অ্যাকশন প্ল্যান জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের সুরক্ষা, টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নতকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান জন ওয়ারবার্টন বলেন, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি একটি উন্নয়ন সংকট, যা মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, এ কারণেই যুক্তরাজ্য সরকার আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে জ্ঞানভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং উষ্ণায়নের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আরও পড়ুন দীর্ঘ হচ্ছে গরমের মৌসুম, বর্ষাকালেও তাপপ্রবাহপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যার সমাধানের পথ এরই এরই মধ্যে বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে হিট অ্যাকশন প্ল্যান, সহনশীল অবকাঠামো, নগর সবুজায়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ প্রযুক্তি মানুষের জীবন রক্ষা, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তবে এসব উদ্যোগ বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়নে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত সমন্বয় এবং সরকারি-বেসরকারি উভয়খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে সরকারগুলোর বর্তমান সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে শহরগুলো ভবিষ্যতেও কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে, নাকি ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হবে। তাই মানুষের সুরক্ষা, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তাপ-সহনশীলতায় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
আইএইচও/ইএ