সন্তানকে সম্পত্তি দানে পিতা-মাতার সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
Advertisement
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ে আইনগত সহায়তা নিয়ে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও ব্লাস্টের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একটি আইন নিয়ে চিন্তা করছি। বাংলাদেশের দেওয়ানি (সিভিল) মামলার অধিকাংশই আসে সম্পত্তির বণ্টন ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে। তাই সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছি। আমাদের মুসলিম আইনে হেবা, হিন্দু আইনে উইল এবং মুসলিম আইনে অসিয়তনামার বিধান রয়েছে। একজন বাবা-মা যদি তাঁর সন্তানদের নামে হেবা করে দেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তি তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। বাবা-মা তখন সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যদি সন্তানরা তাঁদের দেখাশোনা না করে, তাহলে তাঁদের আর কিছু করার থাকে না। তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েন।’
আরও পড়ুন শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা: আইনমন্ত্রীআসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে হেবার পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে গিফটের (উপহার) একটি ধারা রয়েছে। হেবার বাইরেও যে কেউ গিফট করতে পারেন। আমরা ১৯৬৩ সালের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তের (ডিসিশন) ওপর নির্ভর (রিলাই) করে সেই বিধানটি আরও বিস্তৃত (এক্সপ্যান্ড) করতে চাই। সেখানে গিফটের ক্ষেত্রে ইউসুফ্রাক্ট রাইট (জীবনস্বত্ব) রাখতে চাই।’
Advertisement
তিনি বলেন, ‘ধরুন, আপনি সন্তানদের সম্পত্তি হেবা করতে বা উইল করতে চান না। এমনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে চান, যাতে জীবদ্দশায় আপনি নিজেই তা ভোগদখল করতে পারেন।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে গিফটের সঙ্গে জীবনস্বত্ব যুক্ত করা হবে। অর্থাৎ বাবা-মা সম্পত্তি গিফট করে দিলেও যতদিন তাঁরা বেঁচে থাকবেন, ততদিন তাঁরা সম্পত্তি ভোগদখল করবেন। এ সময় সন্তান সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না। বিক্রি করতে হলে বাবা বা বাবা-মায়ের অনুমতি লাগবে। আবার বাবা-মাও বিক্রি করতে চাইলে সন্তানের অনুমতি প্রয়োজন হবে।’
আরও পড়ুন আইনমন্ত্রী / ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে এইচআরডব্লিউ’র পর্যবেক্ষণ আমলে নেওয়া হয়েছেতিনি আরও বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যখন বাবার চিকিৎসার জন্য সম্পত্তি বিক্রি করা প্রয়োজন, কিন্তু সন্তান তাতে সম্মতি দিচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে জেলা জজকে একটি ক্ষমতা দেওয়া হবে। আবেদন করলে জেলা জজ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারবেন।’
মন্ত্রী বলেন, ‘এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনেক দেওয়ানি মামলা কমে আসবে বলে আমরা মনে করছি। অনেক সমস্যার সমাধানও হবে। এভাবেই আমরা নতুন নতুন ধারণা (আইডিয়া) নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।’
Advertisement
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ব্লাস্টের সহযোগিতায় ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পাইলট ভিত্তিতে কোর্ট প্যারালিগ্যাল নিয়োগের মাধ্যমে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্লাস্ট পরিচালিত সফল মধ্যস্থতাকে আইনগত স্বীকৃতি এবং ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যদিকে, ব্র্যাকের সেলপ (এসইএলপি) কর্মসূচির সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পেশাদার মধ্যস্থতাকারীদের প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান, সফল মধ্যস্থতার আইনগত স্বীকৃতি, ব্যর্থ মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন প্রদান এবং যৌথ মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই করা সম্ভব হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখ মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন (পেন্ডিং)। আমাদের আড়াই হাজারের মতো বিচারক ও প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক বিচারাধীন মামলা আমাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
মামলাজট কমাতে আইনগত সহায়তা আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে চাই। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিতে হবে।’
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সে অংশ হিসেবে ব্লাস্ট (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট) ও ব্র্যাক দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক মানুষকে সেবা দিয়ে আসছে। তাদের দক্ষ জনবল, অভিজ্ঞতা, অঙ্গীকার (কমিটমেন্ট) ও জনমুখী নীতি রয়েছে। এসবের সমন্বয়ে আমরা মনে করি, মানুষের কল্যাণে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারব।’
বিভিন্ন জেলায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সুফল তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২০ জেলায় মামলার হার ৬২ শতাংশের বেশি কমেছে। এটি আমাদের আশাবাদী করছে। আমরা মনে করি, এ প্রক্রিয়ায় এগোতে পারলে একদিকে যেমন নতুন মামলা দায়েরের প্রবাহ (ফাইলিং ফ্লো) কমবে, অন্যদিকে বিদ্যমান মামলাজটও কমানো সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিচারকদের কাছে আহ্বান জানিয়েছি এবং বিচার বিভাগের কাছে নিবেদন করেছি, আপনারা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজুলেশন-এডিআর) আরও উৎসাহিত (এনকারেজ) করুন। ভিত্তিহীন (ফ্রিভোলাস) মামলাগুলো আলাদা করে দ্রুত নিষ্পত্তির উপায় বের করুন। আইনি কাঠামোয় কোনো সংশোধন প্রয়োজন হলে আমরা তা করতে প্রস্তুত।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি ব্লাস্ট ও ব্র্যাককে বলব, মামলাজট কমাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা করুন। মালয়েশিয়া দুই বছরের মধ্যে এ ধরনের মামলাজট উল্লেখযোগ্যভাবে (ড্রাস্টিক্যালি) কমাতে পেরেছিল। আপনাদের যদি কোনো গবেষণা বা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকে এবং তার জন্য আইনি সংশোধন প্রয়োজন হয়, তাহলে সে বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা করবেন।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘কোনো মানুষই আইনগত সহায়তার বাইরে থাকবে না। যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের পাশে সরকারি লিগ্যাল এইড টিম রয়েছে। আর সেই টিমের অবিচ্ছেদ্য অংশ ব্লাস্ট, ব্র্যাকের মতো এনজিওগুলো।’
অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম এরশাদুল আলম ও মো. খাদেম উল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসাইন, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনগত সুরক্ষা কর্মসূচি (এসইএলপি) এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব এবং ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
আরএমএম/এসএইচএস