বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প আজ বিশ্বের অনেক দেশেই আলোচিত। অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রবাসী আয়, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি একটি অন্ধকার বাস্তবতা নীরবে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে, তা হচ্ছে মানবপাচার।
Advertisement
মানবপাচার কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা এবং একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ। প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশি উন্নত জীবনের স্বপ্নে দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারান। কেউ পৌঁছান লিবিয়ার মরুভূমিতে, কেউ বলকান রুটের জঙ্গলে, কেউ আবার সমুদ্রপথে প্রাণ হারান। অনেকেই বছরের পর বছর বিদেশে আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
বৈধ অভিবাসনকে অবৈধ পথে ঠেলে দেওয়ামানবপাচারকারী চক্র মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে। তারা উচ্চ বেতনের চাকরি, সহজে ইউরোপ বা আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ কিংবা দ্রুত স্থায়ী হওয়ার প্রলোভন দেখায়। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিশ্রুতি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু বছর ধরে মানবপাচারকারীরা বিভিন্ন অনিয়মিত রুট ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-
উত্তর আফ্রিকার দেশ হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা। বলকান রুট ব্যবহার করে ইউরোপে অনিয়মিত প্রবেশ। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা। মাছ ধরার নৌকা বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে প্রবেশের চেষ্টা। ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।এসব যাত্রাপথে অনেক মানুষ প্রতারণা, নির্যাতন, মুক্তিপণের দাবি, জিম্মি হওয়া, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হন।
Advertisement
মানবপাচারের ফলে ক্ষতি শুধু ভুক্তভোগীর নয়; এর প্রভাব পড়ে প্রতিটি সৎ ও বৈধ ভ্রমণকারীর ওপর। যখন একটি দেশের নাগরিকদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে, অবৈধভাবে অবস্থান করে বা পাচারচক্রের মাধ্যমে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে, তখন অনেক দেশ তাদের অভিবাসন ও ভিসা নীতিতে কঠোরতা আরোপ করে। এর ফলে-
প্রকৃত শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। ব্যবসায়ী, পর্যটক ও গবেষকদের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৈধ যাত্রীদেরও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও কঠোর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। বিদেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে পারে।অর্থাৎ কয়েকটি অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ডের মূল্য দিতে হয় লাখ লাখ নিরপরাধ বাংলাদেশীকে।
দালালচক্র: সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধমানবপাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি দেশের দালাল অন্য দেশের দালালের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। পথে পথে নতুন দালাল যুক্ত হয়, আর প্রতিটি ধাপে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আরও অর্থ আদায় করা হয়।
অনেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু ভুক্তভোগী বিদেশে পৌঁছানোর পর জিম্মি হয়ে পরিবার থেকে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ শ্রম শোষণের শিকার হন, আবার কেউ বছরের পর বছর অবৈধ অবস্থানে থেকে মানবেতর জীবন কাটান।
Advertisement
বাংলাদেশে মানবপাচার প্রতিরোধে আইন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে পাচারচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে অপরাধের ধরন বিবেচনায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষভাবে প্রয়োজন-
আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা। ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ। বিমানবন্দর ও সীমান্তে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার। বিদেশগামী শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ। মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযান জোরদার করা। আরও পড়ুন বিদেশে প্রতারণার শিকার, দেশে ফিরে পুরোনো বাইকের ব্যবসায় সফল মেহেদী নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবেমানবপাচারকারীরা কখনোই ‘স্বপ্ন বিক্রি’ করা বন্ধ করবে না, যদি মানুষ সেই স্বপ্ন কিনতে থাকে। তাই প্রত্যেক নাগরিকের উচিত-
কোনো দালালের কথায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নেওয়া। সরকারি অনুমোদিত মাধ্যমে ভিসা ও চাকরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। অবাস্তব প্রতিশ্রুতি, যেমন ‘নিশ্চিত ইউরোপ’, ‘নিশ্চিত আমেরিকা’, ‘ভিসা ছাড়াই প্রবেশ’ এসব দাবিকে প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করা। পরিবারের সদস্যদেরও এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা।বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ সৎভাবে বিদেশে পড়াশোনা করেন, কাজ করেন, ব্যবসা করেন এবং দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেন। তাদের অর্জনকে ম্লান করে দেয় কিছু সংগঠিত মানবপাচারকারী চক্র। মানবপাচার কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। তাই এই অপরাধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যেদিন মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ, ধারাবাহিক ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে, সেদিন শুধু হাজারো মানুষের জীবনই রক্ষা পাবে না বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং বিশ্বে দেশের সম্মানও আরও সুদৃঢ় হবে।
কেএসকে