জাতীয়

দেশে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে আগ্রহ, ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশেও দ্রুত বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, সফটওয়্যার, শিক্ষা, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবন- সব ক্ষেত্রেই এআই আনছে আমূল পরিবর্তন। এআই নিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় ও শেষ পর্ব আজ।দেশে এআই ডেটা সেন্টার তৈরিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাজ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডিক।

Advertisement

গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা দেশের যে কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে এআই ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

এডিকের দাবি, এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ হলে এআই খাতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বাংলা ভাষাভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরি, এআই গবেষণা ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ৫০ হাজারের বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান ও সরাসরি উপকৃত হবে ৬০ হাজার পরিবার।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডেটা সেন্টার অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।-উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ

Advertisement

এআই ডেটা সেন্টারে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডেটা সেন্টার অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রথম পর্ব:

আরও পড়ুন শিল্প-বাণিজ্য-জীবনধারা বদলে দিচ্ছে ‘এআই’

তিনি বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য ডেটা সেন্টারের ওপর ভর করে এআই সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে স্টার্টআপ, ডেটা সেন্টার অপারেটর, ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্ভাবকরা এর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন ও সেবা তৈরি করতে পারেন। এটি একটি সরকারি উদ্যোগ, যার মাধ্যমে এআইভিত্তিক পাবলিক ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলে দেশের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাত এগিয়ে নেওয়া হবে।’

এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নানা প্রযুক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করছেন। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব আমাদের কাছে আসেনি।-তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা

Advertisement

প্রায় একই ধরনের কথা বলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞাও। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নানা প্রযুক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করছেন। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব আমাদের কাছে আসেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ও ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসতে পারে।’

২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডিক

প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) মাধ্যমে দেশের প্রথম ‘ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার ও কোয়ান্টাম-রেডি সোভরেন কম্পিউট ক্যাম্পাস’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এডিক।

দ্বিতীয় পর্ব

আরও পড়ুন ফের এআই নীতিমালা তৈরির তোড়জোড়

দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে এ অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সহযোগিতা চেয়ে একটি কৌশলগত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর্কিটেক্ট এবং রেইভেন্সবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এস এম আনিসুর রহমানের সই করা প্রস্তাবনাটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এসব বিনিয়োগ আসবে কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টরের মাধ্যমে। অর্থাৎ, বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীর সমন্বয়ে দেশে এই বিনিয়োগ নিয়ে আসতে চায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বাংলাদেশি এআই বিশেষজ্ঞ এস এম আনিসুর রহমান।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। আমরা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য এমন একটি ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে চাই, যা দেশকে একটি ‘এআই ফ্যাক্টরি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।-এস এম আনিসুর রহমান

বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম আনিসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, “বাংলাদেশে অনেকে ডেটা সেন্টারের ধারণা নিয়ে আসছেন, তবে তারা মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই কাজ করছেন। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। আমরা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য এমন একটি ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে চাই, যা দেশকে একটি ‘এআই ফ্যাক্টরি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।”

‘আমরা এমনভাবে এই অবকাঠামো তৈরি করতে চাই, যাতে এটি বাংলাদেশের জন্য ঠিক গার্মেন্টস শিল্পের মতোই একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে,’ বলেন তিনি।

আনিসুর বলেন, ‘সফটওয়্যার, অ্যাপস কিংবা এআই-সংশ্লিষ্ট যে কোনো কার্যক্রম যেন এই ডেটা সেন্টার কেন্দ্র করেই পরিচালিত হতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিভিত্তিক একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পে আমাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা বাংলাদেশে এই দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চাই।’

আরও পড়ুন কাজ সহজ ও দ্রুত করতে ৫ এআই টুল হতে পারে আপনার সঙ্গী

এ বিষয়ে বাংলাদেশে এডিকের প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজুর রহমান (বুয়েট) এবং প্রকল্পের যোগাযোগ পরিচালক আশরাফুল ইসলাম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা জমা দিয়েছি। সিরাজগঞ্জের অর্থনৈতিক অঞ্চল বা কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে স্থান বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক ঘুরে এসেছি। এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

তিন ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে (আগামী ২৪ মাসে) ৩০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফ্রন্টিয়ার এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হবে। এখানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এআই কম্পিউটিং (হাই পারফরম্যান্স কম্পিউট) অবকাঠামো স্থাপন করা হবে, যা সরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সেবা দেবে।

দ্বিতীয় ধাপে (২৪ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে) ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা বাড়িয়ে ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। এর লক্ষ্য, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ‘আঞ্চলিক এআই কম্পিউট হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা।

দীর্ঘমেয়াদে তৃতীয় ধাপে ‘কোয়ান্টাম রেডি ইনফ্রাসট্রাকচার’ যুক্ত করা হবে ও একটি জাতীয় এআই গবেষণা ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলা এলএলএম তৈরির লক্ষ্য

প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ডেটা ও ডিজিটাল সেবা বিদেশি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ভেতরেই ডেটা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় কমবে। এছাড়া জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলা ভাষাভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের তথ্য দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামোর আওতায় সংরক্ষণ করা যাবে।

১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য

প্রস্তাবনায় দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এআই, প্রকৌশল ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে ১০ হাজারের বেশি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সেবাখাতে ৫০ হাজারের বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ৬০ হাজারের বেশি পরিবার উপকৃত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা

ডেটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ১০০ মেগাওয়াটের একটি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আরও সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।

জাতীয় অগ্রাধিকার বিনিয়োগ প্রকল্প ঘোষণার দাবি

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে কয়েকটি নীতিগত সহায়তা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার বিনিয়োগ প্রকল্প’ হিসেবে ঘোষণা, দ্রুত নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান, প্রকল্প এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ নিশ্চিত করা, মাল্টি-টেরাবিট সাবমেরিন কেবল সংযোগ দেওয়া এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল অথবা দেশের অন্য উপযুক্ত স্থানে প্রকল্পের জন্য জমি বরাদ্দ ও মালিকানা চূড়ান্ত করা।

আরও পড়ুন এআই ব্যবহারে কমছে আত্মনির্ভরতা

সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু এডিক নয়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও বাংলাদেশে এআই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ বা এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারেননি তারা।

এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ ইতিবাচক

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই ডেটা সেন্টারে বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ ইতিবাচক। তবে নতুন করে সরকারি অর্থে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিদ্যমান ডেটা সেন্টারগুলোর ব্যবহার, সক্ষমতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘আগের সরকারও বিভিন্ন ডেটা সেন্টার প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে সেগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ব্যবহার কতটা কার্যকর হয়েছে, তার মূল্যায়ন করা উচিত।’

যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এআই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করতে চান, সেটিকে অবশ্যই স্বাগত জানানো উচিত। তবে এই মুহূর্তে সরকারি অর্থে নতুন ডেটা সেন্টারে বড় বিনিয়োগের পক্ষে আমি নই। বরং বেসরকারি খাত সহায়তা দিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করাই বেশি জরুরি।-বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর

ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এআই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করতে চান, সেটিকে অবশ্যই স্বাগত জানানো উচিত। তবে এই মুহূর্তে সরকারি অর্থে নতুন ডেটা সেন্টারে বড় বিনিয়োগের পক্ষে আমি নই। বরং বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করাই বেশি জরুরি।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ। সঠিকভাবে এআই গ্রহণ করতে পারলে ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশের সঙ্গে দক্ষতা ও সেবার মানের যে ব্যবধান রয়েছে, তা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এআই ব্যবহার করে আমরা আরও মানসম্মত, দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সেবা দিতে পারবো।’

শক্তিশালী ডেটা সেন্টার অবকাঠামো থাকলে দেশীয় উদ্যোক্তারা এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন ও সেবা তৈরি করতে পারবেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবেন বলে মনে করেন তিনি।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই যুগে শুধু সফটওয়্যার নয়, সবচেয়ে বড় কৌশলগত অবকাঠামো হলো ডেটা সেন্টার। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে একাধিক ডেটা সেন্টার রয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় ডেটা সেন্টারে জিপিইউ ক্লাউড, এআই কম্পিউটিং ও বাংলা এলএলএম উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার নতুন জিপিইউ অবকাঠামো, প্রায় ৪০ পেটাফ্লপ কম্পিউটিং সক্ষমতা, এআই ক্লাউড ও নতুন ক্লাউড সার্ভিস চালু করেছে, যা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এটিই শেষ নয়। এআই ডেটা সেন্টার শুধু সার্ভার রাখার জায়গা নয়, এটি একটি দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, গবেষণা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্মার্ট সরকার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি।’

আরও পড়ুন ডিআরইউতে কর্মশালা / সাংবাদিকরা জানছেন এআই ব্যবহার ও অপতথ্য মোকাবিলার কৌশল

যে দেশ এআই কম্পিউট নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতের উদ্ভাবন ও অর্থনীতিতেও তারাই নেতৃত্ব দেবে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশের পরবর্তী বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত এআই-রেডি টায়ার-৩/টায়ার-আইভি ডেটা সেন্টার, উচ্চক্ষমতার জিপিইউ ক্লাস্টার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও দক্ষ এআই অবকাঠামোতে। কারণ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু ডেটায় নয়, কম্পিউট পাওয়ারে।’

নজর দিতে হবে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জে

এআই ডেটা সেন্টারে প্রচুর বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার হয় ও এর পরিবেশ দূষণের বিষয়টি নজরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এআই নিয়ে কাজ করা আইটি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট বিল্ডের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার মো. সাহাব উদ্দিন রিয়াদ।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই ডেটা সেন্টারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিশুদ্ধ পানি। এসব ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ ক্লিন ওয়াটার প্রয়োজন হয়। আজ বিশ্বের অন্য কোনো দেশে একটি বড় এআই ডেটা সেন্টার চালু হলেও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই ১০ বছর পরে নয়, এখন থেকেই পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যদি বড় আকারে এআই ডেটা সেন্টার গড়ে ওঠে, তাহলে বিদ্যমান পানি ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।’

আরও পড়ুন সব কাজে এআই ব্যবহার করে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত করছেন না তো?

পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘এআই ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর উচ্চ তাপ উৎপাদন। এসব ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ ওয়াটার কুলিং প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য পরিবেশগতভাবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বজুড়েই এআই ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’

পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম আনিসুর রহমান বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য এমন একটি এআই অবকাঠামো গড়ে তোলা, যা উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেবে, কিন্তু পরিবেশ বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণের সঙ্গে কোনো আপস করবে না। আমরা সরাসরি তরলভিত্তিক কুলিং ও ক্লোজড-লুপ কুলিং সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, যাতে পানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায় এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো যায়।’

পাশাপাশি, সৌর, বায়ু এবং টেকসই বর্জ্য থেকে শক্তি প্রযুক্তি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হলে সেগুলোর মাধ্যমে ডেটা সেন্টারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘ডেটা সেন্টারের প্রতিটি নকশা ও পরিকল্পনা এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে পরিবেশগত প্রভাব সর্বনিম্ন রাখা যায় এবং একই সঙ্গে বিশ্বমানের এআই কম্পিউটিং সক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আমরা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সব কিছু পরিবেশগত আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হবে।’

এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে এগিয়ে চলেছে পুরো বিশ্ব

আন্তর্জাতিকভাবে এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। এআইয়ের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সরাবিশ্বে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য (সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব) ও এশিয়ার (মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারত) বিভিন্ন দেশে শতাধিক বড় ও মাঝারি আকারের এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ বা সম্প্রসারণের কাজ চলছে।

সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও হাইপারস্কেল ও জিপিইউভিত্তিক এআই কম্পিউট ক্যাম্পাসের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশি ও বংশোদ্ভূত অনেকেই বিশ্বে এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশে তারা বিনিয়োগ নিয়ে আসতে চান। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা।

ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ