ভ্রমণ

যে সিঁড়ির সামনে দেওয়া হয়েছিল ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণ

পরদিন সকাল নয়টায় ভার্জিনিয়ার শান্ত, সবুজে ঘেরা ক্লিফটনে প্রভাতী দাসের রাজকীয় বাসভবন থেকে আমাদের নতুন দিনের যাত্রা শুরু হলো। আগের দিনের ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গেছে। সকালের নির্মল আলোয় বাড়ির সামনের সবুজ লন, পরিচর্যায় সুশোভিত ফুলের বাগান ও নীরব পরিবেশ ভ্রমণের জন্য অনন্য আবহ তৈরি করেছিল। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন দেবাশীষ। তার দক্ষ চালনায় পরিবারের সবাই নিশ্চিন্তে যাত্রা শুরু করলাম যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশে। ক্লিফটন থেকে এগোতে এগোতে বিস্তৃত মহাসড়ক, শৃঙ্খলাবদ্ধ যানবাহন, সবুজে ঘেরা পথ ও আধুনিক ভবনের সারি চোখে পড়ছিল।

Advertisement

রাজধানীর কাছাকাছি পৌঁছাতেই মনে হলো ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে নিজেকে উন্মোচন করছে। প্রতিটি রাস্তা ও স্থাপনা আমেরিকার রাষ্ট্রগঠনের দীর্ঘ অভিযাত্রার নীরব সাক্ষী। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল টাইডাল বেসিনের তীরে অবস্থিত জেফারসন মেমোরিয়াল। সাদা মার্বেলের এই স্মৃতিসৌধ দূর থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গাড়ি থেকে নেমে স্মৃতিসৌধের দিকে এগোতেই মনে হলো ইতিহাসের এক পবিত্র প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছি। চারপাশের সবুজ, শান্ত জলরাশি ও নির্মল পরিবেশ স্থানটিকে অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছে। বসন্তে এখানকার চেরি ফুল বিশ্বজুড়ে পরিচিত। যদিও আমাদের ভ্রমণের সময় ফুলের মৌসুম ছিল না, তবু প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মেলবন্ধনে স্থানটি ছিল অনন্য।

১৯৪৩ সালে উদ্বোধন হওয়া স্মৃতিসৌধটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি থমাস জেফারসনের স্মৃতিতে নির্মিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়েও এর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রদর্শনের প্রতি আমেরিকার অঙ্গীকারের প্রতীক। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রধান রচয়িতা জেফারসন ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়ক, দার্শনিক, কূটনীতিক ও জ্ঞানচর্চার প্রবক্তা। তার আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছে। স্মৃতিসৌধটি প্রাচীন রোমের প্যানথিয়নের আদলে নির্মিত। বৃত্তাকার গম্বুজ, আয়নিক স্তম্ভ, খোলা বারান্দা ও সাদা জর্জিয়া মার্বেলের ব্যবহার একে দিয়েছে অনন্য স্থাপত্য সৌন্দর্য। ভেতরে প্রবেশ করলে আলো, ছায়া ও খোলা আকাশের সমন্বয় দর্শনার্থীর মনে গভীর শ্রদ্ধার অনুভূতি সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন ওয়াশিংটন মনুমেন্ট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি

ভবনের কেন্দ্রস্থলে প্রায় উনিশ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জ নির্মিত থমাস জেফারসনের মূর্তি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। তার দৃঢ় অথচ শান্ত দৃষ্টি যেন স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও যুক্তিবাদের চিরন্তন বার্তা বহন করছে। চারপাশের দেওয়ালে খোদাই করা বক্তব্যে মানুষের জন্মগত অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষা ও গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। বারান্দা থেকে টাইডাল বেসিনের শান্ত জলরাশি, দূরের ওয়াশিংটন মনুমেন্ট ও রাজধানীর বিস্তৃত দৃশ্য একসঙ্গে চোখে পড়ে। তখন উপলব্ধি হয়, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু অর্থনীতি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়, তার আদর্শ, মূল্যবোধ ও ইতিহাসকে সম্মান করার সংস্কৃতিতে নিহিত। জেফারসন মেমোরিয়াল শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি আমেরিকার জাতীয় পরিচয়, গণতান্ত্রিক আদর্শ ও নাগরিক চেতনার প্রতীক। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ পর্যটকের আগমনে রাজধানীর পর্যটন অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটনের গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়।

Advertisement

আমার কাছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর মনে হয়েছে, আমেরিকার মানুষ তাদের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তারা তাদের স্মৃতি, দর্শন ও অবদানকে স্থাপত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জীবন্ত করে রেখেছেন। এখানে কৃত্রিম জাঁকজমকের চেয়ে ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার আন্তরিকতা অনেক বেশি অনুভূত হয়। জেফারসন মেমোরিয়াল থেকে বেরিয়ে আমরা কিছুক্ষণ নীরবে চারপাশের পরিবেশ উপভোগ করলাম। সকালের কোমল আলো সাদা মার্বেলের গায়ে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছিল। মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ শুধু একটি ভ্রমণ নয় বরং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবমর্যাদার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি। সেই অনুভূতি হৃদয়ে ধারণ করেই আমরা যাত্রা করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য, ইতিহাসের আরেক অনন্য স্মৃতিচিহ্ন লিংকন মেমোরিয়ালের উদ্দেশে।

জেফারসন মেমোরিয়ালের শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম। দেবাশীষ ধীরস্থির ভঙ্গিতে গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে চললেন ওয়াশিংটন ডিসির আরেক ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নের দিকে। পথের দুপাশে পরিচ্ছন্ন সবুজ প্রান্তর, প্রশস্ত সড়ক এবং দূরে দৃশ্যমান ওয়াশিংটন মনুমেন্ট রাজধানীর সৌন্দর্যকে আরও মহিমান্বিত করে তুলছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শ্রদ্ধেয় স্মৃতিসৌধ লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে। গাড়ি থেকে নেমেই চোখে পড়ল সাদা মার্বেলের বিশাল স্থাপনা। মনে হচ্ছিল এটি শুধু একটি স্মৃতিসৌধ নয় বরং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবমুক্তির এক নীরব মন্দির।

আরও পড়ুন কানাডার টরন্টো থেকে ভার্জিনিয়ায় দীর্ঘপথের গল্প

প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হচ্ছিল ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে চলেছি। চারদিকে বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ নিঃশব্দে চারপাশ দেখছেন, কেউ আবার ইতিহাসের ব্যাখ্যা শুনছেন। ভাষা ভিন্ন হলেও সবার চোখে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা। ১৯২২ সালে উদ্বোধন হওয়া এই স্মৃতিসৌধটি যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের স্মৃতিতে নির্মিত। স্থপতি হেনরি বেকনের নকশায় প্রাচীন গ্রিক ডোরিক মন্দিরের আদলে গড়ে তোলা এই স্থাপনার চারপাশে রয়েছে ছত্রিশটি বিশাল স্তম্ভ, যা লিংকনের মৃত্যুকালে যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রিশটি অঙ্গরাজ্যের প্রতীক এবং জাতীয় ঐক্যের স্মারক।

ভেতরে প্রবেশ করতেই দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল প্রায় উনিশ ফুট উচ্চতার সাদা মার্বেলের আব্রাহাম লিংকনের মূর্তির ওপর। ভাস্কর ড্যানিয়েল চেস্টার ফ্রেঞ্চের নির্মিত এই শিল্পকর্মে লিংকনের মুখাবয়বে দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা, বেদনা ও মানবিকতার অপূর্ব সমন্বয় ফুটে উঠেছে। তার গভীর দৃষ্টি যেন আজও ন্যায়, সমতা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে চলার আহ্বান জানায়। মূর্তির দুই পাশে খোদাই করা রয়েছে তার দ্বিতীয় অভিষেক ভাষণ এবং বিশ্বখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণ। সংক্ষিপ্ত হলেও এই ভাষণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অমর দলিল। জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার পৃথিবী থেকে বিলীন হবে না, এই অমর বাণী আজও বিশ্বের গণতান্ত্রিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি। আব্রাহাম লিংকনের নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে দাসপ্রথা বিলুপ্তির সংগ্রাম। গৃহযুদ্ধের কঠিন সময়ে তিনি শুধু ইউনিয়নকে রক্ষা করেননি, মানবমর্যাদার পক্ষেও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৮৬৩ সালের মুক্তি ঘোষণা লাখ লাখ দাস মানুষের স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করে এবং পরে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথার আইনগত অবসানের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, লিংকনের নেতৃত্ব আমেরিকাকে রাজনৈতিক ও নৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

Advertisement

এই স্মৃতিসৌধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবাধিকারের আরেক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ঠিক এই সিঁড়ির সামনেই ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তার ঐতিহাসিক ‌‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণ প্রদান করেন। বর্ণবৈষম্যমুক্ত, সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের যে স্বপ্ন তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে আছে। লিংকনের দাসপ্রথা বিলুপ্তির আদর্শ এবং কিংয়ের সমঅধিকারের সংগ্রাম যেন এই স্মৃতিসৌধে একই সূত্রে মিলিত হয়েছে। স্মৃতিসৌধের সামনের প্রশস্ত সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রিফ্লেক্টিং পুলের শান্ত জলরাশি, তাতে প্রতিফলিত ওয়াশিংটন মনুমেন্ট এবং দূরের ক্যাপিটল ভবনের গম্বুজ অনন্য দৃশ্য সৃষ্টি করেছে। শত শত মানুষ সেখানে বসে ইতিহাসের আবহ অনুভব করছেন। আমরাও কিছুক্ষণ নীরবে সেই পরিবেশ উপভোগ করলাম। একজন বাংলাদেশি হিসেবে মনে প্রশ্ন জাগল, একটি জাতি কীভাবে তার ইতিহাসকে এত যত্নে সংরক্ষণ করে। তখন উপলব্ধি করলাম, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়, ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মূল্যবোধে গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।

আরও পড়ুন কানাডার টরন্টো শহরের বুকে আরেক বাংলাদেশ

লিংকন মেমোরিয়াল কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি আমেরিকার জাতীয় বিবেকের প্রতীক। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন। তাদের আগমন রাজধানীর পর্যটন অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি ইতিহাসভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত করে। একটি স্মৃতিসৌধ কীভাবে জাতীয় পরিচয়, নাগরিক চেতনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, লিংকন মেমোরিয়াল তার উজ্জ্বল উদাহরণ। বিকেলের কোমল আলো সাদা মার্বেলের গায়ে স্বর্ণালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বিদায়ের আগে আর একবার ফিরে তাকালাম লিংকনের শান্ত অথচ দৃঢ় মুখাবয়বের দিকে। মনে হলো, তিনি যেন আজও মানবসভ্যতাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সমতার এক অবিরাম সাধনা। সেই গভীর অনুভূতি হৃদয়ে ধারণ করেই আমরা লিংকন মেমোরিয়াল ছেড়ে নতুন গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু করলাম। ইতিহাসের এই নীরব প্রহরী এবং তার মানবমুক্তির অমর বার্তা আমাদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অম্লান হয়ে থাকবে।

এসইউ