দেশজুড়ে

রাজশাহীর মাঠজুড়ে আমনের ব্যস্ততা

বর্ষায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে রাজশাহীর কৃষিজমি। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে অনাবৃষ্টির কারণে ফেটে যাচ্ছিল জমির মাটি, সেখানে এখন দেখা মিলছে কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যের। ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামের পথে পথে শুরু হয় কৃষকদের কর্মযজ্ঞ। কেউ কাঁধে ধানের চারা, কেউ ট্রাক্টর নিয়ে জমি প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত। আবার কোথাও নারী-পুরুষ একসঙ্গে কোমর পানিতে নেমে সারিবদ্ধভাবে আমনের চারা রোপণ করছেন। রাজশাহীর গ্রামীণ জনপদজুড়ে এখন আমন রোপণের ব্যস্ততা।

Advertisement

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা তৈরি হয়েছে। এতে আমনের চারা দ্রুত রোপণ করা যাচ্ছে। একদিকে কৃষকের নিরলস পরিশ্রম, অন্যদিকে প্রকৃতির সহায়তা- দুই মিলিয়ে ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখছেন সবাই।

রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে আমন মৌসুম শুধু একটি কৃষি কার্যক্রম নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বছরের এ সময়ে জমির আইল, খাল-বিল, সেচনালা ও কৃষকের উঠানজুড়ে থাকে ব্যস্ততা। বীজতলা থেকে চারা তুলে জমিতে নেওয়া, জমি কর্ষণ, চারা রোপণ ও পরিচর্যা— সব মিলিয়ে কৃষকের কর্মঘণ্টা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আরও পড়ুন বোরো সংগ্রহে ১ কোটি ৬০ লাখ পাটের বস্তা কিনবে সরকার, ব্যয় ১১১ কোটি টাকা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাজশাহীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জমি থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩১ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমিতে আমনের চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বাকি জমিতেও রোপণ শেষ হবে বলে আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

Advertisement

জেলার উপজেলা ও থানা ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মতিহার থানায় ২৭ হেক্টর, বোয়ালিয়া থানায় ১২ হেক্টর, পবা উপজেলায় ৯ হাজার ১৩৪ হেক্টর, তানোর উপজেলায় ২১ হাজার ৯৮০ হেক্টর, মোহনপুর উপজেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর, বাগমারা উপজেলায় ৩ হাজার ৬০০ হেক্টর, দুর্গাপুর উপজেলায় ৫ হাজার ৮৩০ হেক্টর, পুঠিয়া উপজেলায় ৭ হাজার ৩৯৫ হেক্টর, গোদাগাড়ী উপজেলায় ২৩ হাজার ৭৬২ হেক্টর, চারঘাট উপজেলায় ৫ হাজার ৪৪৫ হেক্টর এবং বাঘা উপজেলায় ২ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হবে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের অন্যতম মৌসুম হচ্ছে আমন। বর্ষার বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে এ ফসলের আবাদ হলেও বর্তমানে উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শের কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজশাহীতেও গত কয়েক বছরে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের ধান চাষের আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তানোর উপজেলার কৃষক আনিস আলী বলেন, বৃষ্টি হওয়ার পর জমিতে পর্যাপ্ত কাদা হয়েছে। এখন আর দেরি না করে সবাই ধান লাগাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের এলাকার বেশিরভাগ জমিতে রোপণ শেষ হয়ে যাবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ভালো ফলনের আশা করছি।

বাগমারা উপজেলার কৃষক শহীদ হোসেন বলেন, শুরুর দিকে পানি না থাকায় দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন বৃষ্টি হয়েছে, তাই সবাই একসঙ্গে মাঠে নেমেছে। শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সহজে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও সময়মতো রোপণ শেষ করার চেষ্টা করছি।

Advertisement

আরও পড়ুন উজানের ঢলে হুমকিতে চলনবিলের ধান

পবা উপজেলার কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, এখন কৃষিকাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগের তুলনায় জমি প্রস্তুত করতে সময় কম লাগে। আমরা চেষ্টা করছি সঠিক সময়ে সব কাজ শেষ করতে। কারণ সময়মতো চারা লাগাতে পারলে ফলনও ভালো হয়।

গোদাগাড়ী উপজেলার নারী কৃষক রওশন আরা বলেন, আমাদের পরিবারে সবাই কৃষিকাজ করি। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখন ধান রোপণ ও পরিচর্যায় সমানভাবে কাজ করছে। ভালো ফলন হলে সংসারে স্বস্তি ফিরে আসে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক এলাকায় কৃষকরা দলবদ্ধভাবে একে অপরের জমিতে কাজ করছেন। এতে কাজ দ্রুত শেষ হচ্ছে এবং শ্রমিক সংকটও কিছুটা কমছে। কোথাও কোথাও আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরাও স্বেচ্ছাশ্রমে সহায়তা করছেন। গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি এখনো অনেক এলাকায় টিকে আছে।

কৃষকদের ভাষ্য, আমন ধানের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক সময়ে রোপণ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং অনুকূল আবহাওয়ার ওপর। তাই তারা এখন জমির আগাছা পরিষ্কার, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং চারার যত্নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে রোগবালাই দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখছেন।

গ্রামের বাজারগুলোতেও বেড়েছে কৃষি কার্যক্রমের ব্যস্ততা। ধানের চারা বহনের জন্য ভ্যান, নসিমন ও অন্যান্য পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। সকাল থেকেই হাট-বাজারে কৃষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষিকাজকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় চাষাবাদের গতি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অনেক কৃষক এখন যান্ত্রিকভাবে জমি প্রস্তুত করছেন, ফলে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণও পারিবারিক কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন, যা কৃষিখাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শহরের ভেতর উদ্যান, উদ্যানে এক টুকরো ধানক্ষেত

দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কৃষিই আমাদের প্রধান অবলম্বন। তাই যত কষ্টই হোক, সময়মতো জমিতে নামতেই হয়। ভালো ফলন হলে সব কষ্ট ভুলে যাই। এখন আমাদের একটাই প্রত্যাশা আবহাওয়া যেন শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকে।

মোহনপুর উপজেলার কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, আমন ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি আমাদের পরিবারের বছরের খাদ্য নিরাপত্তার বড় ভরসা। তাই আমরা সর্বোচ্চ যত্ন নিয়েই চাষাবাদ করছি।

গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমন মৌসুম ঘিরে শুধু কৃষকরাই নন, শ্রমিক, পরিবহন চালক, কৃষিযন্ত্রচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অনেক মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এই মৌসুম পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কৃষকদের প্রত্যাশা, মৌসুমের বাকি সময় আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার মাঠভরা সোনালি ধানের হাসি ফুটবে। সেই সঙ্গে কৃষকের ঘরে ফিরবে স্বস্তি।

এদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অনুকূল আবহাওয়া, কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম এবং মাঠ পর্যায়ে নিবিড় তদারকি অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে আমন উৎপাদনে নতুন সাফল্য অর্জিত হতে পারে। এতে শুধু জেলার নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে রাজশাহীর কৃষকরা।

বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চলতি মৌসুমে আমন চাষের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকরা এখন পুরোদমে চারা রোপণের কাজ করছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। উন্নত জাতের ধানের চারা ব্যবহার, সঠিক সময়ে রোপণ, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, আগাছা ও রোগবালাই দমন এবং জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখার বিষয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের মধ্যেও এবার ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রোপণ শেষ করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার ভালো ফলনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ অব্যাহত থাকবে, যাতে তারা কাঙ্ক্ষিত ফলন অর্জন করতে পারেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, এরই মধ্যে রাজশাহী জেলায় ৩১ হাজারের বেশি হেক্টর জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে মাঠে রোপণ কার্যক্রমের গতি আরও বেড়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই জেলার সব উপজেলায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমন রোপণের কাজ সম্পন্ন হবে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, সঠিক সময়ে চারা রোপণ, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জমির পরিচর্যার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আবাদ সম্পন্ন হলে রাজশাহীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত ধান উৎপাদন সম্ভব হবে, যা জেলার কৃষি অর্থনীতি ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এফএ/জেআইএম