জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসককে গালিগালাজ, শারীরিক লাঞ্ছনা, সাম্প্রদায়িক কটূক্তি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
Advertisement
এ ঘটনায় পেশাগত নিরাপত্তা ও বিচার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন ট্রেইনি ও রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা। এক বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ‘বাংলাদেশ সোসাইটি অফ নিউরোসার্জনস’ (বিএসএনএস)।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবেচিকিৎসকদের বিবরণে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই বিকেলে নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডের পার্পল ইউনিটের ৯২৯ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হন। ২৫ দিন আগে রাপচার্ড অ্যানিউরিজমের অস্ত্রোপচার হওয়া ওই রোগী টানা ১৮ দিন আইসিইউতে ছিলেন। শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইসিইউ-লেভেলের কেয়ারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও স্বজনদের চাপে তাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
ঘটনার দিন বিকেলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে (জ্বর ১০২ ডিগ্রি এবং অক্সিজেনের মাত্রা ৯২% এ নেমে যায়) ডিউটিরত রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. শুভ বণিক তাৎক্ষণিক রোগীকে চেস্ট ফিজিওথেরাপি, অক্সিজেন ও নেবুলাইজেশন দেন এবং অনকল কনসালটেন্ট ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে অবহিত করেন। তবে আইসিইউতে বেড খালি না থাকায় পুনরায় স্থানান্তরে বিলম্ব হয়।
Advertisement
পরে একটি অচেনা নম্বর থেকে ডা. শুভ বণিকের ফোনে কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি পরিচয় দিয়ে সালাউদ্দিন অত্যন্ত অশালীন ভাষায় কথা বলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফোনে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘তুই কে? তোর মতো সামান্য ডাক্তার আমি ঘণ্টায় ঘণ্টায় তৈরি করি। তুই হিন্দু, তুই ফ্যাসিস্ট... তোর বাপকে ডাক, দেখি তোকে কে বাঁচায়’
আরও পড়ুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় / ‘আপনি তো আর বেশিদিন নাই স্যার’—হল প্রাধ্যক্ষকে ছাত্রদল নেতার হুমকিপরে ডা. শুভ বণিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে সহকারী অধ্যাপক ডা. নূর মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে কেবিন ব্লকে গেলে অভিযুক্ত সালাউদ্দিন ও তার সহযোগীরা তাদের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ডা. শুভ বণিকের কলার চেপে ধরে ধাক্কা দেওয়া হয়, তাকে পা ধরে মাফ চাইতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় এবং শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। সাহায্য করতে আসা সহকারী অধ্যাপক ডা. নূর মোহাম্মদকেও হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে প্রাণভয়ে তারা সেখান থেকে কেটে পড়ে অপারেশন থিয়েটারে আশ্রয় নেন।
ঘটনার পর জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের কয়েকজন রেসিডেন্টদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য না দেওয়ার জন্য চাপ দেন। পরে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল রহমান হাসপাতালে এসে বিষয়টি কোনো বিচার ছাড়াই মিমাংসা করে ক্ষমা করে দেওয়ার পরামর্শ দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রেইনি চিকিৎসকরা।
‘বাংলাদেশ সোসাইটি অফ নিউরোসার্জনস’র বিবৃতি/ছবি: জাগো নিউজ
Advertisement
এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো চিকিৎসক ডা. সাবাকে এক আইসিইউ কনসালটেন্ট কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে হেয় করেন এবং অন্য চিকিৎসকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সোসাইটি অফ নিউরোসার্জনসের ক্ষোভ ও বিচার দাবিবাংলাদেশ সোসাইটি অফ নিউরোসার্জনস (বিএসএনএস)-এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদুল হক স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কর্তব্যরত চিকিৎসকের ওপর এ ধরনের হামলা শুধু একজন চিকিৎসকের ওপর আক্রমণ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। কোনো পরিস্থিতিতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
আরও পড়ুন কুড়িগ্রাম হাসপাতাল / সব রোগের চিকিৎসা করেন সেকমো!সংগঠনটির পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানানো হয়।
ঘটনার বিষয়ে যা বললেন হাসপাতাল পরিচালকরেসিডেন্ট চিকিৎসকের ওপর হামলা ও হুমকির বিষয়ে জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক নুরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, সেগুলো আমরা মিটআপ করছি। আমি আজও এটা নিয়ে একটা তদন্ত কমিটি করেছি। মোটামুটি এটা সেটেল। বাকিটা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আসার পর সেই মোতাবেক আমরা কাজে আগাবো।’
তিনি বলেন, ‘এটা যে একটা একটা মিস ইনসিডেন্স, মিস ইনসিডেন্স মানে ওই একজন মানুষের যদি বাবা চরম অসুস্থ হয়, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে একটু ডিফারেন্ট হবে। এটা আপনার জন্যও সত্য, আমাদের সবার জন্যই সত্য। সেই ব্যক্তি ও ডাক্তারের সঙ্গে যে ঘটনাটা ঘটছে, সেটা সম্পূর্ণভাবেই অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত। যে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে ইনসিডেন্স হয়েছে, আমরা তাদের নিয়ে বসছি। পরে আমরা তাদের (অভিযুক্তদের) আবার ডাকবো, ডেকে তাদের সঙ্গে এটা নিয়ে আমরা একটা সেটেলমেন্টে যাবো। এটা ছোট্ট একটা ঘটনা ছিল, মানে খুব বড় ধরনের কোনো প্রবলেম হয়নি।’
এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা সালাউদ্দিনের মুঠোফোনে চেষ্টা করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এসইউজে/ইএ