বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে সার্কুলার অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর ম্যান-মেড ফাইবারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সহজ হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
Advertisement
রোববার (২ আগস্ট) বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড গ্রিন গ্রোথ ওয়ার্কিং কমিটির পঞ্চম সভায় এসব তথ্য উঠে আসে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ড. ফাহমিদা খানমের সভাপতিত্বে সভায় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিল্পখাতের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আরও পড়ুন পোশাক শিল্পের উদ্ভাবনী বার্তা নিয়ে এক যুগ পর ফিরছে বাটেক্সপোসভায় ‘বাংলাদেশের প্লাস্টিক রিসাইক্লিং নীতির গতিশীলতা: চ্যালেঞ্জ, নীতিগত ঘাটতি এবং সার্কুলার প্লাস্টিক-টু-টেক্সটাইল অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশলগত পথরেখা’ শীর্ষক একটি নীতিপত্র উপস্থাপন করা হয়।
Advertisement
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. ফাহমিদা খানম বলেন, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসি) এবং জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সার্কুলার অর্থনীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্কুলারিটি-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ এখন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সবুজ ব্যবসা ও টেকসই শিল্পায়ন। এ লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাত ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ফাহমিদা খানম জানান, ধাপে ধাপে একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) প্লাস্টিক অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্লাস্টিক স্টিকযুক্ত কটন বাড, প্লাস্টিক স্টিরার ও প্লাস্টিক স্ট্র নিষিদ্ধের উদ্যোগ চলছে। তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য যৌক্তিক সময় দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
আরও পড়ুন গ্যাস সংকটে স্থবির আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল, শিপমেন্ট নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠাতিনি আরও বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিবন্ধন দিয়ে থাকে। এ দুই মন্ত্রণালয়ের তথ্য সমন্বয় হলে নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন সহজ হবে।
Advertisement
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. রেজাউল করিম বলেন, এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) শিগগির বাস্তবায়ন করা হবে। পুনর্ব্যবহৃত পিইটি এর মান নির্ধারণে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও জানান তিনি।
বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখনো বাধ্যতামূলক মানদণ্ডের আওতায় না থাকায় বিএসটিআই মান নির্ধারণ করতে পারছে না। এ বিষয়ে ড. ফাহমিদা খানম বলেন, ভবিষ্যতে কম্পোস্টেবল প্লাস্টিকের দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, কারণ বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) গবেষণা চালাচ্ছে বলেও সভায় জানানো হয়।
পরে বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম নীতিপত্র উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, দেশে প্রতি বছর ৮ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর মাত্র ৩৬ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। মূল্য শৃঙ্খলের বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক এবং অর্থায়নের অভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, এ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এনে সম্প্রসারণ করা গেলে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি আমদানিকৃত ম্যান-মেড ফাইবারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রিন ডিল ও ইপিআর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
নীতিপত্রে জাতীয় সার্কুলার ইকোনমি নীতি প্রণয়ন, সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে সার্কুলার ইকোনমি কাউন্সিল গঠন, বর্জ্য সংগ্রহ, মান নির্ধারণ ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়ন এবং পিইটি স্ক্র্যাপ আমদানির ক্ষেত্রে আইএসও ১৫২৭০ -ভিত্তিক প্রি-শিপমেন্ট সার্টিফিকেশন চালুর সুপারিশ করা হয়।
সভায় বিজিএমইএর পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বলেন, কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নির্ধারিত সংগ্রহ কেন্দ্র ও যৌক্তিক মূল্য কাঠামো প্রয়োজন। বস্ত্রখাতে সুশৃঙ্খল বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি রিসাইক্লিং শিল্পে কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং মডেল চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামীম বানু শান্তি ক্ষতিকর বর্জ্য নিষিদ্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ওয়ারপোর পরিচালক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন শিল্পখাতে নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন জ্বালানি আমদানির চাপে আবারও ঊর্ধ্বমুখী ডলারের বাজারউর্মি গ্রুপের সাসটেইনেবিলিটি প্রধান এবিএম ফখরুল আলম বলেন, লাফার্জহোলসিমের সহযোগিতায় জিওসাইকেল বাংলাদেশ শিল্পকারখানার স্লাজ কো-প্রসেসিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যয় বেশি হওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট মডেল বাস্তবায়ন করলে এ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
ইউনিডোর ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আসাদ উন-নূর বলেন, প্রস্তাবিত গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড মূলত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী। ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য এ তহবিলের সুযোগ সীমিত।
বিকেএমইএর যুগ্মসচিব ফারজানা শারমিন বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে রেসপনসিবল বিজনেস কনডাক্ট (আরবিসি) সেল গঠন করেছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ও এ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাভিদ শফিউল্লাহ প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে একজন করে ফোকাল পয়েন্ট মনোনয়নের সুপারিশ করেন। তিনি সার্কুলার অর্থনীতি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এ লক্ষ্যে বিল্ডের সহযোগিতা কামনা করেন।
আইএইচও/ইএ