উত্তরের দারিদ্রপীড়িত জেলা কুড়িগ্রাম। এ জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স, জনবল ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক সংকট এতটাই প্রকট যে ৩৭১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। ফলে প্রতিদিন শত শত রোগী দীর্ঘ অপেক্ষা, ভোগান্তি ও সীমিত চিকিৎসাসেবা নিয়ে ফিরছেন।
Advertisement
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি পরে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০১৭ সালে এটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত হলেও জনবল কাঠামো সে অনুযায়ী বাড়েনি। বর্তমানে ৩৭১ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২০ জন। ৩৪০ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১৬০ জন। যা ১০০ শয্যার হাসপাতালের জনবলের সমান।
আরও পড়ুন যেভাবে চলছে পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসাখোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসক সংকটের কারণে ওয়ার্ডে দিনে একবারের বেশি রোগী দেখা সম্ভব হয় না। দুপুরের পর ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বা সেকমো প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করতে হয় পরদিন সকাল পর্যন্ত। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদনও তাৎক্ষণিক দেখানোর সুযোগ না থাকায় অনেক রোগীর মূল চিকিৎসা শুরু হতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়।
Advertisement
অন্যদিকে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজারের অধিক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতালের মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও কার্ডিওলজি বিভাগে কোনো সিনিয়র কনসালটেন্ট নেই। অ্যানেসথেসিয়া ও অর্থোপেডিক সার্জারি ছাড়াও সিনিয়র কনসালট্যান্টের আটটি পদ শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে ছয়টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া মেডিকেল অফিসার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার, রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রারের একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি। হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের সেবাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
আরও পড়ুন পরিদর্শিকার কক্ষে ডিএনসি, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে রোগীএছাড়া হাসপাতালের পুরোনো ভবনের পাশে আটতলা নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও সেখানে এখনো আইসিইউ ও নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের রংপুরে পাঠাতে হচ্ছে। এতে পথে অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।
এদিকে হাসপাতালে ইকোকার্ডিওগ্রাম, এন্ডোস্কপি ও ল্যাপারোস্কপি মেশিন কয়েক বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অপারেশন যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার আধুনিক অটোক্লেভ না থাকায় পুরোনো একটি ছোট মেশিন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ছয়টি ইসিজি মেশিন প্রয়োজন হলেও রয়েছে মাত্র তিনটি। দুটি এক্স-রে ও দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল আছেন মাত্র একজন।
Advertisement
এছাড়াও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও দীর্ঘদিনের। আয়া, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীর বহু পদ শূন্য। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য আউটসোর্সিংয়ে অন্তত ১৫০ জন কর্মী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৭ জন।
আরও পড়ুন হাসপাতালে দ্বিগুণ হচ্ছে শয্যা, জনবল-বাজেট কি বাড়বে?হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, এখানে চিকিৎসক সংকট প্রকট। ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ৩৭১ জন চিকিৎসক থাকার কথা, অথচ আছেন মাত্র ২০ জন। এই ২০ জন চিকিৎসক দিয়েই গড়ে ৫০০ ভর্তি রোগীর সেবা দিতে হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। সীমিত জনবল ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন এই হাসপাতালের সেবা চালু রাখাই আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, পুরোনো ভবনটি বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও রোগীর চাপে সেখানে সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। নতুন ভবনটি আইসিইউর উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে অপারেশনের পর রোগীদের নিবিড় পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় স্থান ও জনবল নেই। শুধু আইসিইউ চালু করলেই হয় না, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও থাকতে হয়। তা না হলে অপারেশনের পর রোগীর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কুড়িগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি ও সাবেক সিভিল সার্জন মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও আধুনিক চিকিৎসাসুবিধার অভাবে জেলার মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চালু এবং আইসিইউ-এনআইসিইউসহ বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
রোকনুজ্জামান মানু/এফএ/জেআইএম