জাতীয়

‌‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ নিয়ে সংলাপ চলছে আগারগাঁওয়ে

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিএফসিসি) হলে চলছে ‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সংলাপ। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় বিসিএফসিসির কার্নিভ্যাল হলে এ সংলাপ শুরু হয়।

Advertisement

প্রাপ্তি, সংলাপ সহযোগী, সিপিডি আয়োজিত এ সংলাপে ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬: জাতীয় নির্বাচন ও রূপান্তরের প্রত্যাশা’ খসড়া উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

ওই নাগরিক ইশতেহারে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে’ একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল রাষ্ট্রগঠনের প্রথম ও সবচেয়ে গভীর মোড়-যেখানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যবিরোধী চেতনা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি স্থাপন করে।’

‘স্বাধীনতার পর সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় লক্ষ্য হয়ে ওঠে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। জাতি গঠনের পাঁচ দশকের উত্থান-পতন, আশা-নিরাশার দোলাচল পেরিয়েও আমরা আজও সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটছি। এই সময় থেকেই নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য রাষ্ট্র-বহির্ভূত শক্তি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, মানবাধিকার রক্ষায় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ভাবনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এসেছে। এই পথ চলায় ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বাধীনতা-উত্তর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বাঁক, যখন নাগরিক সমাজ, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক শক্তি একত্রে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি তোলে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রের উপরি কাঠামোর বিভিন্ন পরিবর্তন হলেও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন রয়ে গেছে অসম, ভঙ্গুর এবং নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। বিশেষত গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, প্রতিষ্ঠানগত দুর্নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা গভীর শাসন-সংকট তৈরি করে। বৈষম্য, বঞ্চনা এবং সুশাসনের ঘাটতির এই পুঞ্জীভূত বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সামনে আনে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। এটা ছিল ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভয়ভীতি ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও জোরালো প্রত্যাঘাত। এই অভ্যুত্থানে উচ্চারিত হয় একটি স্পষ্ট উপলব্ধি-এটাই সময় অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের। তাই ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪ এই তিন সময়ের চেতনার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য বা দ্বন্দ্ব নেই। এ ছিল সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিক প্রকাশ ‘

Advertisement

ওই ইশতেহারে আরও বলা হয়, আন্দোলন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং দেশের রাজনীতি রূপান্তরের এক নতুন বাঁকে উপনীত হয়। ৫ আগস্টের পর উদ্ভূত বাস্তবতা এই প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করেছে। রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনা নতুন গুরুত্ব ও তাগিদ পেয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিক প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। প্রশ্ন উঠছে নির্বাচনি ইশতেহারে কী এই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে? রাজনৈতিক নেতারা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা কী বাস্তবে রূপ নেবে? পরিবর্তনের আলোচনায় ও বাস্তবায়নে কারা অন্তর্ভুক্ত হবে, আর কারা আবারও উপেক্ষিত থেকে যাবে?

‘একটি বৈষম্যবিরোধী ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, জীবন ধারণের প্রথাগত চিন্তার বাইরের মানুষগুলো ও প্রান্তিক ও পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রচিন্তা ও নীতি-আলোচনার কেন্দ্রস্থলে তাদের কণ্ঠস্বরকে স্থান দিতে হবে। এই রূপান্তরকালীন অতীতের মতো আবার হতাশা যেন ফিরে না আসে এবং চলমান সংস্কারের গতি যেন ব্যাহত না হয়-এই উপলব্ধি থেকেই নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’

আমাদের এই উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলা, দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৮টি আঞ্চলিক পরামর্শ সভা এবং ১৫টি যুব কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে ৩৫টি জেলার প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন স্থানীয় অংশীজন ও তরুণদের মতামত ও সুপারিশ সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মন্তব্য বাক্স ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মতামত আহরণ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের ১৫০টিরও বেশি সহযোগী সংগঠন সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা মানুষের অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ-ভিত্তিক আশা-আকাঙ্ক্ষা শোনার ও নথিভুক্ত করার চেষ্টা করেছি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনা শেষে ‘নির্বাচন পরবর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?’ এমন প্রশ্নের ওপর উপস্থিতিদের ভোট নেওয়া হয়। এ ভোটে সবাই নিজ নিজ মতামত দেন। পরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ মতামতের ওপর আলোচনা করেন।

Advertisement

সংলাপে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত আছেন।

এমএমএ/এমআরএম/জেআইএম