ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে বুড়াগৌরাঙ্গ নদী। নদীর বুকে বাড়তে শুরু করে ছোট ছোট নৌকা। নৌকার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা মাঝির ডাকে ভাঙতে থাকে প্রকৃতির নীরবতা। জেলের হাতে জাল, মনে সংসারের চিন্তা, চোখে ভরসা শুধু নদীর ওপর।
Advertisement
হঠাৎ কারো জালে বড় কোনো মাছ পড়তেই-হই হই আওয়াজ-‘এহহহ, জালে মাছ পড়ছে, মাছ পড়ছে’। এই দৃশ্য প্রতিদিনের, তবুও এখানকার মানুষের কাছে প্রতিটি সকালই নতুন। কারণ প্রকৃতি আর নদীর সঙ্গে প্রতিদিনই নতুন কোনো গল্প রচিত হয় এই জনপদে। জলস্রোতে গড়ে ওঠা সেই গল্পগুলোকে ঘিরেই চলে লাখো মানুষের জীবনতন্ত্র। ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন যে সংগ্রাম, সেটাই বুড়াগৌরাঙ্গের জীবন সরব, জটিল, তবে গভীর মাধুর্যে ভরা।
উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলা এবং ভোলার কিছু অংশে বিস্তৃত বুড়াগৌরাঙ্গ নদী। নদীর শেষমাথা তেঁতুলিয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে নেমেছে। এই নদী মানুষকে দিয়েছে বাঁচার রসদ। তেমনি এ অঞ্চলেও মানুষও নদীর সঙ্গে গড়ে তুলেছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
দক্ষিণাঞ্চলের জনপদে প্রবাহিত এই নদী কেবল একটি জলধারা নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নদীতীরের শতাধিক গ্রামের কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা। এই নদীর ওপর নির্ভরশীল বহু জেলে পরিবারের জীবিকা। এসব ছাড়াও বুড়াগৌরাঙ্গ নদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Advertisement
ভোরের আলো ফুটতেই বুড়াগৌরাঙ্গের তীরে দেখা মিলবে কর্মচাঞ্চল্য। জাল হাতে জেলেরা নেমে পড়েন নদীতে। বিশেষত ইলিশ মাছ শিকারের জন্য এই নদী বেশ পরিচিত। এছাড়াও কারো জালে ধরা পড়ে রুই, কাতল, পোয়া, রামসোস, আইড়, বোয়াল কিংবা চিংড়ি। স্থানীয় বাজারে সেই মাছ বিক্রি হয়, তৈরি হয় আয়-রোজগারের চক্র। এরই মধ্যে অগণিত পরিবারের দৈনন্দিন আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে এই নদীর মাছ। যা স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
এমনই একজন জেলে চর কচ্ছপিয়ার রহমান মুসল্লি। জানালেন, নদীতে মাছ ধরাই ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধের প্রধান পেশা। তার জালে ধরা পড়া মাছগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেই চলে পরিবারের খরচ। তিনি বলেন, ‘এই নদীতেই আমার বাপ-দাদায় মাছ ধরে আমাদের বড় করছেন। এখন আমি ধরি, ছেলে-মেয়ে পালি (পালন করা)। বুড়াগৌরাঙ্গ না থাকলে আমরা খাইতাম (খেতাম) কী? নদী আমাদের মা।’
শুধুই মাছ ধরা নয়, নদীর পাড়ের মানুষদের জীবিকা বহুমাত্রিক। জেলেদের পাশাপাশি মাঝি, নৌকা নির্মাতা, জাল বোনার কারিগর, মাছ ব্যবসায়ী সবাই কোনো না কোনোভাবে বুড়াগৌরাঙ্গের ওপর নির্ভরশীল। নৌ-যোগাযোগ বা স্থানীয় ব্যাবসা সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে বুড়াগৌরাঙ্গ। বর্ষা মৌসুমে অনেক এলাকায় নদীপথই হয়ে ওঠে প্রধান চলাচলের মাধ্যম। শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন নদীপথ ব্যবহার করে তাদের গন্তব্যে পৌঁছান। এতে একদিকে যেমন সময় ও খরচ কমে, অন্যদিকে নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে।
কৃষিতেও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নদীর পানিতে সেচ দিয়ে চাষ হয় ধান, সবজি ও ফসল। বর্ষায় নদীর পলিমাটি আশপাশের জমিকে করে তোলে উর্বর। ফলে নদীকেন্দ্রিক কৃষিই অনেক পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নদীর চরগুলোতেও গড়ে উঠেছে মৌসুমি চাষাবাদ, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি গতি এনে দিয়েছে।
Advertisement
নদীর পানিতে সেচ দিয়ে কৃষকরা চাষ করেন ধান ও শীতকালীন সবজি। কৃষক মো. সোলায়মান জানান, নদীর পানি না পেলে জমিতে ফসল হতো না। বর্ষায় নদীর পলিমাটি জমিতে পড়লে ফলনও ভালো হয়। আন্ডার চর এলাকার গৃহবধূ রাহেলা বেগম বলেন, ‘চরে সবজি লাগাই। এতে ঘরের খরচ কিছুটা হলেও উঠে আসে। নদী আমাদের এই সুযোগটা দিয়েছে।’
এই নদী মানুষকে দিয়েছে পরিচয় ও সংস্কৃতি। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বসতি, বাজার, ও যোগাযোগের পথ। নদীর তীরেই বসে সন্ধ্যার আড্ডা, শিশুদের খেলাধুলা। নারীদের দৈনন্দিন কাজ কিংবা বয়স্কদের বিশ্রাম সর্বত্রই নদী যেন নীরব সঙ্গী। এছাড়াও কখনো নৌকাবাইচ, কখনো ধর্মীয় আচার কিংবা লোকজ উৎসবে নদী হয়ে ওঠে মানুষের মিলনস্থল। বিয়ে, উৎসব কিংবা সামাজিক মিলনমেলাতেও নদীর তীর হয় প্রাঞ্জল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই সংস্কৃতি চলছে নদীটিকে ঘিরে।
প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক জীবন্ত দলিল বুড়াগৌরাঙ্গ নদী। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর এই জীবনমুখর চিত্র আজ নানা সংকটে আচ্ছন্ন। নদীর কিছু কিছু স্থানে ভাঙনের ফলে বসতভিটা হারাচ্ছেন মানুষ। কোথাও অবৈধ দখল ও দূষণে নদীর স্বাভাবিক গতি থমকে যাচ্ছে। কোথাও পলিজমাটে নাব্যতা কমছে, ফলে স্বাভাবিক প্রবাহ থমকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে মাছের বংশ বিস্তারে। এতে জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়ছে।
তাইতো স্থানীয়দের কণ্ঠে শোনা যায় উদ্বেগের সুর। তারা বলছেন, বুড়াগৌরাঙ্গ নদী বাঁচলে বাঁচবে জনপদ। নদী খনন, দখলমুক্তকরণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নদী রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্থানীয়দের মতে, বুড়াগৌরাঙ্গ নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। নদীনির্ভর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে বুড়াগৌরাঙ্গ। এছাড়াও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বুড়াগৌরাঙ্গ নদী রক্ষায় এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, নদীকে রক্ষা করা মানেই জনপদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। পটুয়াখালীর রাঙাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বাসিন্দা ও শিক্ষক আইয়ুব খান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের জনজীবনে বুড়াগৌরাঙ্গ নদী এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা। এই নদীটি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি একটি জনপদের প্রাণরেখা। নদীকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়েই টিকে থাকবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনতন্ত্র, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ। নদী ও মানুষের এই পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষাই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, ‘এ নদী বহন করে মানুষের আশা, সংগ্রাম আর জীবনের গল্প। নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে আছে জনপদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তাই নদীকে বাঁচানো মানেই এই জনপদের জীবনতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা।’ আরও পড়ুনএসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগরকুমড়া বড়িতে সচ্ছলতা ফিরছে গ্রামীণ পরিবারে
কেএসকে