০৩.পরদিন, বিষ্যুদবার। এদিন আড়তে কাজ থাকে বেশি। সারাদিন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকলেও শ্রমিকটিকে কিছুই বুঝতে দিলো না জেবু। গতকাল কী হয়েছে, তা নিয়ে একবার মুখ খুললো না। গত দিনগুলোর মতোই স্বাভাবিক ছিল সে। তবে মাঝেমধ্যে আড়চোখে দেখছিল তাকে। চোখে চোখ পড়লেই লজ্জা পাওয়ার মতো দ্রুততার সঙ্গে তার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল। বেলা ডোবার আগে হাতের কাজ যখন শেষ হলো; তখন সে শ্রমিকটির কাছে গেল। তার কপালের ঘামে লেপ্টালেপ্টি করে থাকা কয়েকটা চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘আমার ভাই তোমাকে দেখতে চেয়েছে।’
Advertisement
শ্রমিকটি আগাপাছতলা না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলো। কারণ তার তরফ থেকে এ রকম একটা প্রস্তাবের অপেক্ষায় ছিল সে। হবু শ্যালককে দেখতে যাবে, খালি হাতে তো যাওয়া যায় না, তাই ফুটপাতের দোকান থেকে পাউরুটি ও বিস্কুট কিনল; তারপর বগল দাবাতে দাবাতে তার সঙ্গে এলো সে।
শ্যালককে দেখার জন্য শ্রমিকটির তর সইছিল না। তার ভেতরে অচেনা উত্তেজনা কাজ করছিল। ভাবছিল, তার শ্যালক না জানি কী! উঠোনে পা রেখে অস্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘কোথায় তোমার ভাই? ওকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে পড়েছি।’জেবু তাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল।বেঙ্গা বুবুর আগমনের অপেক্ষায় যেমন ছিল; তেমন ছিল সজাগ। পুরুষের গলা পেয়েই বুঝে গিয়েছিল, বুবু সেই মানুষটিকে তার সঙ্গে নিয়ে এসেছে। লজ্জায় কিংবা খেয়ালবশে, যা হোক, ঘরে ঢোকার আগেই একটা ছেঁড়া চাদরে নিজেকে আপাদমস্তক আবৃত্ত করল সে। শ্রমিকটি যেন অধৈর্য হয়ে পড়ল, ‘কোথায় তোমার ভাই?’জেবু তার ভাইয়ের শরীরের ওপর থেকে চাদরটা একটানে সরিয়ে নিলো। বেঙ্গা কাঁচুমাচু করছিল, আর শ্রমিকটি সঙ্গে সঙ্গে বিস্মিত নেত্রে বলে উঠল, ‘এই তোমার ভাই! একে দিয়ে তো ফুটপাতে ভিক্ষা করানো সম্ভব।’
তার বাজে মন্তব্য আহত করল জেবুকে। কড়া উত্তর দিতে পারতো কিন্তু এ মুহূর্তে সমীচিন মনে করল না সে। অপমান হজম করে শীতল মেজাজে বলল, ‘হ্যাঁ, এই আমার ভাই। আমাকে বিয়ে করতে চাইলে তার দায়িত্ব নিতে হবে। পারবে?’শ্রমিকটির মনে হলো তার মন্তব্যের কারণে পরিস্থিতি একটু বিগড়ে গেছে, বিগড়ানো পরিস্থিতি মেরামত করার উদ্দেশে কণ্ঠে দরদ ফুটিয়ে বলল, ‘পারব না কেন? তোমার ভাই মানে আমার ভাই। তাছাড়া আমার কোনো ছোটভাই নাই।’ বলার পর খাটের একপাশে বসল সে। তারপর পাউরুটি ও বিস্কুট তার সামনে দিয়ে আবারও বলল, ‘আজ থেকে তুমি তোমার ভাই পেলে। মনে করো আমি তোমার বড়ভাই।’বেঙ্গার জড়তা কাটল। খুশি হয়ে বলল, ‘তাহলে আজ থেকে আপনি আমার দুলাভাই।’শ্রমিকটি তার মাথা ঝাঁকাল।
Advertisement
০৪.পরদিন দুপুরে সখী কাজ করতে এসে দেখে বেঙ্গা চরম আনন্দে। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা বেদনার কলতান থেকে তাকে অনেক দূরে মনে হচ্ছিল। তার চোখের সামনে থেকে অভাব-অনটনের দরজাগুলো বিলীন হয়ে যাবে, বুবুর কবুল বলা পর্যন্ত অপেক্ষা। তারপর তার ভাগ্যে এমন কিছু ঘটবে, যা দেখে তাকে আর কেউ কটাক্ষ করতে পারবে না। কেউ বলতে পারবে না, বেঙ্গা আবার মানুষ নাকি! ও তো কোলাব্যাং।
বেঙ্গা শুকনো পাউরুটি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিল, সেখান থেকে এক টুকরো পাউরুটি ছিঁড়ে সখীকে দিলো। সখী হতভম্ব হয়ে বলল, ‘কিরে বেঙ্গা, কোনোদিন তো খেতে বলিস না। তোর মতলব কী?’বেঙ্গা নির্লজ্জের মতো হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমাকে ভালোবাসি। বিবাহ করুম।’রাগে মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল তার, তবুও শান্ত গলায় বলার চেষ্টা করল সে, ‘আমি তোর মার বয়সী।’বেঙ্গা আরও সহজ হয়ে বলল, ‘আমি তো দাঁড়াতে পারি না, হাঁটতে পারি না। তাই আমি এমন কাউকে বিবাহ করতে চাই, যে আমাকে কোলে-কাঁখে নেবে, তার সন্তানের মতো লালনপালন করবে।’‘ওরে শয়তান! তোর মনে এত কিছু!’ চিৎকার করে ওঠার পর আবার বলল সে, ‘তোকে ভালোবাসতে আসি না। সামান্য কটা টাকার বিনিময়ে তোকে করুণা করতে আসি। তোর মতো নুলা, খোঁড়া, কুৎসিতকে কে বিয়া করবে, বল? থু!’ তারপর মেঝেয় থুথু ছিটিয়ে অনেকটা দৌড়ের মতো ঘর ছাড়ল সে।
বেঙ্গার জোয়ারসম উচ্ছ্বাস কর্পূরের মতো উবে গেল। তার কুৎসিত মুখটা ভয়ানক বীভৎস রূপ নিলো। বোঁচা নাকে শুয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করল। এ মুহূর্তে তাকে দেখলে জঙ্গলের বাঘ-ভালুকও ভয় করবে, লেজ নিচু করে পালাবে।
০৫.সন্ধ্যারাতে ফিরল জেবু। তাকে বিষণ্ন, মলিন ও বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। আড়তে গিয়ে জানতে পারে শ্রমিকটি আড়তের কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। ভাইয়ের সামনে কী বলবে, যুৎসই জবাব মনে মনে খুঁজছিল সে। তার মাথা কাজ করছিল না। ক্রমশ নেতিয়ে পড়ছিল। নেতানো শরীরে ভাইয়ের পাশে শুয়ে পড়ল। মুখে রা নেই। বেঙ্গা দেখতে যেমনটাই হোক, তার ব্রেইন টনটনে। বুবুর মেজাজ ধরতে পারল সে। কারণ, তার আগে তার বুবু এরকম কখনোই করেনি। মৌমাছিদের গমগম শব্দের আলোড়ন তুলে ঘরে ঢুকত সে। মেজাজমর্জির পারদ উঁচু থাকলে হাসির ফোয়ারা তুলে বলত, ‘আমার লক্ষ্মী ভাইটি কোথায় রে?’‘বুবু, কিছু তো একটা হয়েছে।’ বেঙ্গার কণ্ঠে সংশয়।‘না, তেমন কিছু হয়নি।’ মুখ লুকাচ্ছিল সে।
Advertisement
বেঙ্গার জেরার মুখে অবশেষে বলতে বাধ্য হলো সে, ‘তোর মতো ভাই ঘরে থাকলে কেউ আমাকে বিয়া করবে না, বুঝলি? সব আমার কপাল!’ বলতে বলতে কাঁদল সে। সে কান্না থামছিল না কিছুতেই। বেঙ্গার খুব খু-উ-ব খারাপ লাগছিল। কষ্টেসৃষ্টে তার একটা হাত বুবুর শরীরের ওপর তুলে দিয়ে সে-ও কান্নায় ভেঙে পড়ল।
০৬.সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা।একটা বিদেশি গবেষণা টিম এসেছে নেদারল্যান্ড থেকে। সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে যারা বিকলাঙ্গ, অবহেলিত এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত, তাদের যৎকিঞ্চিত সহায়তা করতে এবং তাদের দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে। সংগৃহীত রক্ত তারা নিজ দেশে নিয়ে গিয়ে তাদের ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করবে। গবেষণার ফলাফল তাদের কাছেই থাকবে। এদের ব্যবহার করবে গিনিপিগ হিসেবে।
মাইকিং করে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের স্কুলমাঠে প্রোগ্রামটা চলবে। জেবু সখীকে ডেকে আনল। তার সহায়তায় ভ্যানে উঠালো বেঙ্গাকে। বেঙ্গা প্রথম প্রথম গোঁ ধরেছিল, আসবে না। যখন সখীকে দেখেছে, তখন থেকে নিশ্চুপ সে। একেবারে লক্ষ্মীছেলে আর কী!
স্কুলমাঠে অনেক মানুষের সমাগম। নুলো, খোঁড়া, গন্নাকাটা, পেটফোলা, পাছামোটা অনেকেই এসেছে; কিন্তু বেঙ্গা তাদের চাইতে ব্যতিক্রম। একেবারে আলাদা; যাকে বলে আজব! সোনালি চুল, শরীরে সাদা লোম, তিলে ভরা গা এবং ধবধবে শাদা ডাক্তার ও নার্স রোগী দেখছেন। এক নার্স প্রেসার মাপছেন, আর যিনি ডাক্তার তিনি নিজে সূচ ফুটিয়ে রক্ত নিচ্ছেন। আরেক নার্স রক্তের ব্যাগে রোগীর নাম-ধাম-বয়স সম্বলিত লেবেল সেঁটে দিচ্ছেন। বিদায়বেলা সবার হাতে তুলে দিচ্ছেন নতুন জামাকাপড় এবং নগদ অর্থ।
নতুন জামাকাপড় পেয়ে বেজায় খুশি বেঙ্গা। হাতে টাকাও পেয়েছে; কাজেই কাউকে পরোয়া করে না সে। ভ্যানের ওপর নতুন কাপড়ের ব্যাগটা পড়ে ছিল, কী ধরনের জামাকাপড়, তা দেখতে সখী ব্যাগে কেবল হাত দিয়েছে, অমনি তার হাত থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিলো সে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে কী যেন বলতে চেয়েও বলল না। একটু হলেও লজ্জার প্রলেপ পড়ল সখীর মুখে। জেবুর চোখ এড়ায়নি তা। তার প্রলেপটুকু মুছিয়ে দিতে মনগড়া একটা জোক বলল সে। প্রলেপ প্রশমিত হলো বটে, কিন্তু বেঙ্গা রেগে ফায়ার। কাপড়ের ব্যাগটা ভ্যান থেকে ছুঁড়ে ফেলল রাস্তায়। সখী ব্যাগটা কুড়িয়ে আনলে জেবা তার চোখে চোখ রেখে ইশারায় বোঝাল, চুপ! কিচ্ছু বলা যাবে না।
স্বর্গধামে ঢুকেই বায়না ধরল সে, নতুন জামাকাপড় তাকে পরিয়ে দিতে। পরিয়ে দেওয়া হলো। এরপর তার ভাবসাব আলাদা। বুবুকে একের পর এক অর্ডার করতে লাগল। এর চাইতে হাজারগুণ অর্ডার তামিল করতে হয় আড়তে। এ আর তেমন কী! ভাইয়ের সর্বশেষ অর্ডার, ‘বুবু, বেলের সরবত খাব! যেখান থেকেই পাও, কিনে আনো।’জেবু মোটেও রাগল না; বরং এটাকে নিছক পাগলামি হিসেবে উপভোগ করল। হাসিমুখে বেল কিনতে যাচ্ছিল, এমন সময় ষাটোর্ধ্ব এক মুরুব্বি, মুখভর্তি কাশফুলের বাগান এবং আলঝেইমার রোগীর মতো তার হাত কাঁপছিল, পথ আগলালেন তার। তার বিয়ের ঘটকালি করতে চান। সম্মতি দিলে আজ সন্ধ্যায় বরপক্ষ তাকে দেখতে আসবে। বর অবস্থাশালী; কাজেই হাতছাড়া করলে পস্তাতে হবে। তাছাড়া বরের কোনো ডিমান্ড নেই। যেহেতু যৌতুকের ব্যাপার-স্যাপার নেই, তাই রাজি হলো জেবু। তবে বিশাল খরচাপাতির চিন্তায় কপালের ভাঁজ প্রকট হলো। গরিবের ঘরে হাতির পা পড়বে, অথচ থাকবে না আয়োজন, তা কী করে হয়? ঘটক সেই সমস্যার সমাধানও করে দিলেন, ‘হ্যাঁরে মা, এক গেলাস করে পানিও দিতে পারবি না।’ পরক্ষণে মাথা চুলকাতে চুলকাতে আবার বললেন, ‘ছেলের সংসারে আগের পক্ষের দুটা ছেলেমেয়ে আছে। সমস্যা হবে না তো! আগেই সব ফাইনাল করা ভালো। কী বলো, মা?’জেবু প্রজ্ঞাবতীর মতো উত্তর দিলো, ‘তারা তাদের রিজিক নিয়েই দুনিয়ায় এসেছে। তাদের প্রতি সৎমা হিসাবে আমার যা কর্তব্য, তাই করবো।’মুরুব্বি হাসতে হাসতে চলে গেলেন।
জেবু উঠোনে পা ফেলতেই টের পেল বেঙ্গা। ঘরের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘সরবতে চিনি দিবা। না থাকলে সখীদের বাড়ি থেকে আনবা।’ঘরের চৌকাঠে পা দিয়ে তাতিয়ে উঠল সে, ‘সখীদের বাড়ি কি তোর শ্বশুরবাড়ি? জিনিস চাইলেই পাবি।’ একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার বলল, ‘কথার ফাঁক পেলেই সখী, সখী, সখী। সখীরে কি বিয়া করবি?’‘হ, করুম,’ বেঙ্গা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল।‘যে পুরষ হাগতে পারে না, ছুঁচতে পারে না, সে করবে বিয়া!’ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল সে।‘এই সালাউদ্দিন একদিন বিবাহ করে তোমাকে দেখাবে, বুবু। আগে তোমারটা হোক।’‘আগে আমারটাই হবে, বুঝলি? আজ সন্ধ্যায় বরপক্ষ দেখতে আসবে। বেল কিনতে যেতে পারলাম না আর। চিন্তা করিস না! কাল এনে দিব। আড়তের পাশে ফলের দোকান।’‘বুবু!’ খুশিতে টগবগ বেঙ্গা।‘তবে সাবধান! বরপক্ষ যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ ঘরেই লক্ষ্মীছেলের মতো থাকবি। তোর কারণে বিয়াটা আবার ভাঙুক, আমি তা চাই না,’ তাকে সতর্ক করল সে।বেঙ্গার মন ছোট হয়ে এলো। মুখে কুলুপ আঁটলো সে।
চলবে...
আগের পর্ব পড়ুন>> জিল্লুর রহমান শুভ্রর গল্প: বেঙ্গা- পর্ব ০১
এসইউ