আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে দেশের তরুণ ভোটাররা। বিপুল এই গোষ্ঠীর মন জয় করতে নির্বাচনি ইশতেহারে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাই হয়ে উঠছে নির্বাচনি প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর তাই তরুণদের মন জয় করতে কর্মসংস্থান, বেকার ভাতাসহ নানা আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি থাকছে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে।
Advertisement
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠী শুধু সংখ্যায় নন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও ডিজিটাল সক্ষমতার দিক থেকেও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
তরুণ ভোটারের সংখ্যা ও বয়সভিত্তিক চিত্রনির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে ১৮-২১ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন। ২২-২৫ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ জন এবং ২৬-২৯ বছর বয়সী ভোটার ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন। ৩০-৩৩ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন। এই চার বয়স শ্রেণি মিলিয়ে তরুণ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটিতে। অন্যদিকে ৬০ বছরের বেশি বয়সী ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৯৩ লাখের বেশি।
আরও পড়ুনদলগুলোর ইশতেহারে নগর সরকার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবআদিবাসীদের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কী আছে দেখতে চাইবিএনপিকে ‘শ্রমিক ইশতেহার’ দিলো অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সনির্বাচনি সমঝোতায় এনসিপিতে ‘আদর্শ বনাম কৌশলের দ্বন্দ্ব’
Advertisement
মধ্যবয়সী ভোটারদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তবে সংখ্যাগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের দিক থেকে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
কর্মসংস্থানে গুরুত্ব বিএনপিরতরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রস্তুত করেছে বিএনপি। যেখানে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে দলের ঘোষিত ৩১ দফা, জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি থাকবে।
জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের আদলে বাংলাদেশে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকারও ইশতেহারে স্থান পাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়ানো, স্কুল পর্যায় থেকেই ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করছে বিএনপি। তথ্যপ্রযুক্তি, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, ডেন্টাল হাইজিন, মেডিকেল টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা চালুর কথা ইশতেহারে বলা হবে।
প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা এবং মাধ্যমিক স্তর থেকে আরও একটি ভাষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আরবি, জার্মান, ফরাসি, জাপানি ও চীনা ভাষা শেখার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।
Advertisement
আরও পড়ুননারী-শিশুর অধিকারকে নির্বাচনি ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বানদলীয় ইশতেহার তৈরিতে অনলাইনে জনগণের পরামর্শ নেবে জামায়াতসুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতে ৬ দফা ইশতেহার দিলো শিশুরা
‘আলিবাবা’ ও ‘অ্যামাজনে’র মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি, ১০ লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সারের নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে পেপাল ও ওয়াইজ চালু, ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান, প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন, ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড, পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি গাছ লাগানো এবং চা শিল্পে চাঁদাবাজি বন্ধ ও দুর্নীতি দমনের পরিকল্পনাও থাকছে দলটির ইশতেহারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকে আমাদের কাজ করতে হবে। এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান; এটা আমরা হোমওয়ার্ক করেই বলেছি। তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
জামায়াতের দৃষ্টি বাস্তবমুখী কর্মসংস্থানজামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে তরুণদের জন্য নৈতিক শিক্ষা, কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে।
দলটির মতে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের চাকরির উপযোগী করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও তরুণরা চাকরি পাচ্ছেন না। এই সংকট উত্তরণে ইশতেহারে তারা কর্মমুখী শিক্ষা চালুর অঙ্গীকার করেছে।
এছাড়া শিশু বয়স থেকেই নৈতিকতা, সততা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছে জামায়াত, যা ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্বে রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে দেখছে দলটি। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষা ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দলটির।
আরও পড়ুনসড়ক দুর্ঘটনা রোধের পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্তের দাবিরাজনৈতিক দলের ইশতেহারে এসডিজি বাস্তবায়নের বিষয় রাখার তাগিদতরুণদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে চায় নাসির উদ্দীন কমিশন
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা দলটির। দেশীয় শিল্প বিকাশ, আমদানি-রপ্তানিতে স্বচ্ছতা, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির কথা বলেছে দলটি। আর বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, ব্যয় কমানো ও সিন্ডিকেট ভাঙার ঘোষণা দেওয়া হবে তাদের ইশতেহারে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ তরুণ। তাদের জন্য আমাদের আগ্রহ অনেক বেশি। আমরা বলে আসছি, বেকার ভাতা নয়, কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেব। বেকারত্ব নির্মূলে আমরা কাজ করবো।
এনসিপির লক্ষ্য তরুণদের হাত ধরে রাষ্ট্র পুনর্গঠনজুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ইশতেহারে তরুণদের রেখেছে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দলটির ২৪ দফা ঘোষণার বড় অংশই তরুণদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
জানা গেছে, এনসিপি তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নতুন সংবিধান ও ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দলটি মনে করে, বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা তরুণদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দমিয়ে রেখেছে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজানো ও প্রশাসনকে সেবামুখী করার মাধ্যমে তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় দলটি।
এনসিপির ইশতেহারে তারুণ্য ও কর্মসংস্থানকে আলাদা দফা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল বিপ্লবকে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এনসিপি।
ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা সংস্কার, গবেষণায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হবে ইশতেহারে।
নারীদের জন্য নিরাপত্তা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন, ধর্ম-বর্ণ-জাতিসত্তাভেদে সমতা এবং জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, এসব বিষয় এনসিপির ইশতেহারে থাকবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর জাগো নিউজকে বলেন, আমরা দল থেকে একটি ইশতেহার দিবো। আসন সমঝোতা হয়েছে যেসব দলের সঙ্গে, সবাই মিলে একটা আলাদা ইশতেহার দেবো। ইশতেহারে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে। তরুণ প্রজন্মের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহারের প্রণয়নের কাজ চলছে।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে চায় ইসলামী আন্দোলনজামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে টানাপোড়েন ও নানা নাটকীয়তার পর ২৬৮ আসনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ক্ষমতায় এলে তারা তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিদেশে যাওয়া শ্রমিকের মানোন্নয়ন করতে চায়। সব ধরনের শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও শিল্পায়ন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাণিজ্যের সঙ্গে শিক্ষাকে সমন্বয় করার ইশতেহার আনছে দলটি।
জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কোনো মুখরোচক গাল-গল্প ইশতেহারে দিচ্ছি না। এতদিনের মধ্যে কোটি কোটি কর্মসংস্থান.. অনেকে বলছেন। যেটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব নয়।’
‘আদর্শমুখী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের যেতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, বিভিন্ন কম্পিউটার ল্যাংগোয়েজ শেখানোর পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিল্পায়ন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাণিজ্যের সঙ্গে শিক্ষাকে সমন্বয় করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থানে আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের শ্রমিকরা স্বল্প বেতনে কাজ করছেন। বিদেশে দক্ষ লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। মোটকথা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগানো হবে।’
কর্মসংস্থান ও বিকেন্দ্রীকরণে মনোযোগ জাতীয় পার্টিরজাতীয় পার্টির বিভাগীয় সম্পাদক (দপ্তর সম্পাদক) মাহমুদ আলম বলেন, ‘ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। ইশতেহারে সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কর্মমুখী শিক্ষায় বেশি জোর দেওয়া হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি শিল্পায়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে রাজধানীকেন্দ্রিক মনোযোগ কমানো হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।’
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার প্রয়োজন। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছি তার ওপর। আমাদের তরুণদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ এবং মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘তরুণদের জন্য যদি মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারি, তাদের জন্য যদি সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি তবে ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ড বাস্তবে প্রতিফলিত হবে।’
ইশতেহারকে স্বাক্ষরিত দলিল উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে তাদের মতামত ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এখানে তাদের মতামতগুলো সুনির্দিষ্ট থাকা দরকার ও অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন হওয়া বাধ্যতামূলক।’
এসএম/এমআইএইচএস/এমএমএআর/জেআইএম