মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
Advertisement
ম্যারাথন শুধু দৌড় নয় এটি ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাসের দীর্ঘ পথচলা। এই পথচলার একজন নিবেদিত যাত্রী সামছু উদ্দিন। নোয়াখালীর সন্তান সামছু উদ্দিন বর্তমানে বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত। এক ভাই ও দুই বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির জীবনে পরিবারই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশেষ করে মা, স্ত্রী এবং ভাই-বোনদের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন তার দৌড়জীবনের প্রতিটি ধাপে সাহস জুগিয়েছে। খাবার, বিশ্রাম এবং সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবারের সহযোগিতাই তাকে নিয়মিত ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল সামছু উদ্দিনের। স্কুল-কলেজে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। তবে ম্যারাথনের প্রতি প্রকৃত আগ্রহ জন্ম নেয় কর্মজীবনে এসে। এক সহকর্মীর হাতে পাওয়া একটি ম্যারাথন মেডেলই যেন বদলে দেয় তার ভাবনার দিক। সেই মেডেল দেখে মনে হয়েছিল ‘উনি যদি পারেন, আমি পারবো না কেন?’ ছোটবেলার আগ্রহ আর এই আত্মবিশ্বাস মিলেই শুরু হয় তার ম্যারাথন যাত্রা।
২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথনে ১০ কিলোমিটার দৌড় ছিল সামছু উদ্দিনের প্রথম ম্যারাথন। প্রথম অংশগ্রহণ হলেও সেই অভিজ্ঞতা তাকে এতটাই আনন্দিত করে যে, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০টির মতো ম্যারাথন ও দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন সামছু উদ্দিন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টার্কিশ এয়ারলাইন্স অ্যাক্টিভপ্লাস হাফ ম্যারাথন ২০২৫ (১৫ কিলোমিটার), স্পোর্টস বাংলা সামার রান ২০২৬, জেসিআই রেইজ আপ রান, ইন্সপায়ারিং বাংলাদেশ রান ২০২৫, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন ২০২৫, ঢাকা মেট্রো হাফ ম্যারাথন এবং পেকালি বাংলাদেশ উইন্টার রান ২০২৬।
Advertisement
ম্যারাথনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সামছু উদ্দিন ধাপে ধাপে অনুশীলনের ওপর জোর দেন। হঠাৎ করে বেশি দৌড় নয় ধীরে ধীরে ট্রেনিং শুরু, নিয়মিত অনুশীলন, শরীরের শক্তি বাড়ানো, খাবার ও পানির দিকে নজর, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম সবকিছুই তার প্রস্তুতির অংশ। পাশাপাশি সঠিক জুতা ও পোশাক ব্যবহার এবং মানসিক প্রস্তুতিকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তার মতে, ম্যারাথন যতটা শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মানসিক খেলা।
এই দীর্ঘ দৌড়জীবনে তিনি অর্জন করেছেন ৩০টিরও বেশি পুরস্কার মেডেল, সার্টিফিকেট এবং বিভিন্ন ধরনের সম্মাননা। প্রতিটি পুরস্কার তার কাছে শুধু সাফল্যের চিহ্ন নয়, বরং আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা। তবে তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন ২০২৫-এর সেই প্রথম ১০ কিলোমিটার দৌড়। সেই রানের আনন্দই তাকে পরবর্তী প্রতিযোগিতাগুলোতে আরও উৎসাহ নিয়ে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে।
অনেকে প্রশ্ন করেন এত সময় দিয়ে ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার মানে কী? সামছু উদ্দিনের উত্তর পরিষ্কার। তার মতে, ম্যারাথন শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার একটি কার্যকর উপায়। নিয়মিত দৌড় হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী করে, স্ট্রেস কমায় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। সময় অবশ্যই যায়, কিন্তু এটি সময় নষ্ট নয় এটি নিজের স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ। অসুস্থ হলে যে সময় ও অর্থ নষ্ট হয়, তার তুলনায় ম্যারাথনের প্রস্তুতিতে দেওয়া সময় অনেক বেশি মূল্যবান।
ম্যারাথনের পথে আনন্দের পাশাপাশি কষ্টও আছে। সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটি আসে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর সময় দীর্ঘ ক্লান্তি, ব্যথা আর পরিশ্রমের পর সেই শেষ রেখা ছুঁয়ে ফেলার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অন্যদিকে সবচেয়ে দুঃখের মুহূর্ত ছিল একটি রেসে শেষ কয়েক কিলোমিটারে পায়ের মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা শুরু হওয়া। সেদিন প্রত্যাশামতো দৌড় শেষ করতে না পারলেও সেই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য আর মানসিক শক্তির মূল্য।
Advertisement
ম্যারাথনে অংশ নিতে গিয়ে শারীরিক ক্লান্তি, ব্যথা, মানসিক চাপ, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা সবই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসব বাধাই একজন রানারকে আরও শক্ত করে তোলে। বিশেষ করে যারা বেসরকারি চাকরি করেন, তাদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সামছু উদ্দিন। তার পরামর্শ অফিসের আগে ভোরে বা অফিস শেষে সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময় বের করে অনুশীলন করা, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং শরীরের যত্ন নেওয়া।
ভবিষ্যতে সামছু উদ্দিন নিয়মিত দৌড়ের মাধ্যমে নিজেকে আরও ফিট রাখতে চান। সামনে আরও বড় ম্যারাথন ও হাফ ম্যারাথনে অংশ নিয়ে নিজের টাইম ও সহনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। পাশাপাশি নতুন যারা দৌড় শুরু করতে চান, তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে উৎসাহ দেওয়ার ইচ্ছাও আছে। তার বিশ্বাস ম্যারাথন কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি জীবনধারা, যা মানুষকে শেখায় ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং নিজের সীমা অতিক্রম করার সাহস।
আরও পড়ুননতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!মাদুলির মোড়কে নিরাপত্তার খোঁজ, ভ্রান্ত বিশ্বাসে বাঁধা বাস্তবতা
কেএসকে/এমএস