এ দেশে খাবার কতটা নিরাপদ? এ প্রশ্নের কোন সুখকর জবাব নেই। আমদানি ও দেশে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা এখানে সবসময়ই যৎসামান্য। যদিও এ ভূমিকা জোরদার করতে ২০১৫ সালে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এবার জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় নেওয়া প্রকল্পে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছে তারা।
Advertisement
সাধারণ মানুষ ও খাদ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মনে করে, সারাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকারী এ সংস্থার মাঠ পর্যায়ে সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ কম। জনবলেও ঘাটতি প্রকট। ফলে দেশবাসীর মুখে নিরাপদ খাদ্য তুলে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বিএফএসএ।
তবে সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে এ সংস্থার সীমাবদ্ধতা কাটাতে ও খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় ‘ফুড সেফটি টেস্টিং ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে সংস্থাটি।
ওই প্রকল্পটি প্রায় ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার। যার আওতায় ঢাকায় একটি রেফারেন্স ল্যাবরেটরি, অফিস, প্রশিক্ষণ ভবন এবং চট্টগ্রাম ও খুলনায় দুটি বিভাগীয় পরীক্ষাগারসহ অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদকাল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০৩৪ সাল পর্যন্ত দশ বছরের জন্য শুরু হয়েছে।
Advertisement
এসব বিষয়ে বিএফএসএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জাকারিয়া জাগো নিউজকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যত বড় কাজ, সে তুলনায় আমাদের যাত্রা খুব অল্প সময়ের। এ সংস্থার ল্যাবের ঘাটতি রয়েছে। যার জন্য এবার জাইকার সহায়তায় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেটা হলে আমরা অনেক এগিয়ে যাবো।
তিনি বলেন, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ল্যাব নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। জনবল নেওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বলা হচ্ছে। প্রকল্প থেকেও জনবল নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে আমাদের আরও জনবল প্রয়োজন। তবে এটা হুট করে বাড়ানো যায় না। যেহেতু এ কাজে এক্সপার্ট লোক প্রয়োজন, সেজন্য ধাপে ধাপে নিতে হয়। যাদের আনা হোক না কেন, তাদের প্রশিক্ষণ দরকার, সেটার আগে ক্যাপাসিটি দরকার। যে কারণে ধাপে ধাপে জনবল বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি আমরা বেশকিছু আইন ও বিধিমালা নতুন করে সংস্কার করছি। সেগুলো বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সমন্বয় করে করছি।
Advertisement
বিএফএসএ মনে করে, পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি উৎপাদিত ও প্রস্তুতকৃত সব খাদ্য নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারছে না। দেশে যেসব খাদ্য ও খাদ্য উপাদান আমদানি হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে না সংস্থাটি। এছাড়া বেশ কিছু আইনি দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সেগুলো কাটিয়ে উঠার উদ্যোগ রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য দিবস আজএ অবস্থায় আজ (সোমবার) দেশে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ পালিত হচ্ছে। এ বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিক করি, সুস্থ সবল দেশ গড়ি’।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের অডিটোরিয়ামে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে । ওই সভায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার উপস্থিত থাকবেন।
গত বছর যেমন তদারকি করেছে সংস্থাটিবড় কোনো পরিবর্তন না থাকায় বিগত ১১ বছর কিছু রুটিন কার্যক্রম চালিয়ে যায় এ বিএফএসএ। এর মধ্যে বড় কাজ খাদ্য পরীক্ষা।
গত বছরের (২০২৫) ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী খাদ্যের নিরাপদতায় ঝুঁকি ভিত্তিক ২ হাজার ২১টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করেছে বিএফএসএ। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৩২টি নমুনা মানসম্মত পেয়েছে। আর ৬৮৯টি খাদ্যের নমুনা মানসম্মত নয়।
এছাড়া, ২০২৫ সালে মোবাইল ল্যাবের মাধ্যমে ১১ হাজার ৯১৮টি তাৎক্ষণিক খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে; যার মধ্যে, ১০ হাজার ৩২২টি নমুনা মানসম্মত এবং ১৫৯৬টি মানসম্মত নয়।
মিনি ল্যাবের মাধ্যমে ১১ হাজার ২২০টি তাৎক্ষণিক খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে ৬ হাজার ৫৬৭টি নমুনা মানসম্মত এবং ৪ হাজার ৬৫৩টি খাবার মানহীন পেয়েছে বিএফএসএ।
সব পর্যায়ের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৬ হাজার ২৪২টি খাদ্য স্থাপনা ও বাজার মনিটরিং করা হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২০৪টি খাদ্য স্থাপনায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে, যেখানে ২১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া ওইসব মোবাইলে কোর্টে এক কোটি তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করেছে কর্তৃপক্ষ।
খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা রক্ষার্থে ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ৭৩ টি খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে হেলথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে।
এছাড়া, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকল্পে খাদ্যশৃঙ্খলের সাথে সম্পর্কিত ৭৩১০ জন খাদ্যকর্মীকে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান ও নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে গ্রামীণ নারীদের স্বচ্ছ ধারণা দেওয়ার জন্য নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে ৯৩৩০ জন গৃহিণীর সঙ্গে ২৬৭টি সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক করেছে কর্তৃপক্ষ।
মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৬২৪২টি খাদ্যস্থাপনা ও বাজার মনিটরিং ও খাদ্য স্থাপনার মানের ভিত্তিতে ৮১১টি খাদ্যস্থাপনাকে গ্রেডিং এবং ১৭৮টি রি-গ্রেডিং দিয়েছে।
এনএইচ/এএমএ