প্রবাস

অটোমেশনের পথে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। মালয়েশিয়া প্ল্যান অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে মোট ১৫ শতাংশ বিদেশিকর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। অটোমেশনের ফলে সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

Advertisement

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ৫ শতাংশ বিদেশি কর্মী কমানো হবে। এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে নির্মাণ, প্ল্যান্টেশন, উৎপাদন ও সেবাখাতে কর্মরত লাখো বিদেশি শ্রমিকের ওপর যাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশি।

সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে, ভবিষ্যতে অদক্ষ কর্মী নিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে। পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও দক্ষ জনশক্তির দিকে ঝুঁকবে মালয়েশিয়া।

কুয়ালালামপুরভিত্তিক শ্রমবাজার বিশ্লেষক দাতুক আজমান হাশিম বলেন, মালয়েশিয়ার অর্থনীতি এখন শ্রমঘন কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে অটোমেশন ও এআই-নির্ভর উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। এতে বিদেশি অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমবে।

Advertisement

বিদেশি কর্মী নিরুৎসাহিত করতে সরকার চালু করেছে মাল্টি-টায়ার লেভি সিস্টেম। এতে অদক্ষ কর্মীর জন্য লেভি বেশি। দক্ষ কর্মীর জন্য লেভি কম ফলে নিয়োগকর্তাদের জন্য অদক্ষ কর্মী নেওয়া হবে ব্যয়বহুল, আর দক্ষ কর্মী তুলনামূলকভাবে লাভজনক।

একজন উৎপাদন খাতের ব্যবসায়ী লিম চেন ওয়েই বলেন, আগে ১০ জন অদক্ষ কর্মী নেওয়া সহজ ছিল। এখন একই খরচে আমরা ৩-৪ জন দক্ষকর্মী নিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারছি।

নিয়োগকর্তাদের কড়া বার্তা: মানুষ নয়, প্রযুক্তি সরকার এরই মধ্যে নিয়োগকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে। কর্মীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে।

ফ্যাক্টরি, লজিস্টিকস, ফার্মিং ও কনস্ট্রাকশন খাতে অটোমেশন, রোবটিক্স ও স্মার্ট মেশিন ব্যবহারে ভর্তুকি ও করছাড়ও দেওয়া হচ্ছে।

Advertisement

বিদেশিকর্মী কমানোর আরেকটি বড় কৌশল হলো মালয়েশিয়ান নাগরিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষ করে তোলা। সরকারি উদ্যোগে চালু হয়েছে টেকনিক্যাল ট্রেনিং ডিজিটাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট।

এক বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ বলেন, সরকার স্পষ্টভাবে চায় আগে মালয়েশিয়ান, পরে বিদেশি। দক্ষতা থাকলে দেশীয়রাই চাকরি পাবে।

নতুন নীতিতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে সোর্স কান্ট্রি রেশিও বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো একটি দেশ থেকে অতিরিক্ত কর্মী নেওয়া হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এতে বাংলাদেশ, নেপাল বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের জন্য কোটা আরও সংকুচিত হতে পারে।

বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মালয়েশিয়ার ‘দুর্নাম’। রিক্রুটমেন্ট অনিয়ম, অতিরিক্ত ফি, সিন্ডিকেট ও মানবপাচার অভিযোগে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একজন মালয়েশিয়ান সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শ্রম কেলেঙ্কারি না হয়, সেজন্য বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে অনেকেই দ্বিধায় আছে।

কুয়ালালামপুরে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসী রফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন কর্মী আসা কমলে যারা আছি, তাদের ওপর কাজের চাপ বাড়বে। আবার চাকরি বদলও কঠিন হবে। এজন্য সংকটে পড়বে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে আরেক প্রবাসী সাইফুল আলম বলেন, দক্ষতা না বাড়ালে ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হবে। শুধু শ্রম দিয়ে আর চলবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার এই নীতির মূল বার্তা পরিষ্কার- অদক্ষ বিদেশি শ্রমের যুগ শেষের পথে। দক্ষতা, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছ নিয়োগই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশসহ সোর্স কান্ট্রিগুলোকে এখনই কৌশল বদলাতে হবে না হলে, ২০৩৫ সালের আগেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমআরএম/এমএস