ফিচার

ক্ষমতার আড়ালে বিকৃত লালসা: এপস্টেইন থেকে ইতিহাসের কুখ্যাত শাসকরা

ক্ষমতা মানুষকে কী দেয় নিরাপত্তা, প্রভাব, নাকি ভয়ংকর দায়মুক্তি? জেফরি এপস্টেইনের নামটি সামনে এলে এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি উঠে আসে। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে এপস্টেইন কেস দেখিয়েছে, অর্থ ও ক্ষমতার জোরে কীভাবে বছরের পর বছর ধরে শিশু যৌন নির্যাতন ও পাচারের মতো অপরাধ আড়ালে রাখা যায়। আদালতের নথি, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং তদন্তে উঠে এসেছে রাজনীতিবিদ, ধনকুবের, রাজপরিবার-ঘনিষ্ঠ বহু প্রভাবশালীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। এপস্টেইন একা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে ক্ষমতাবানরা নিজেদের অপরাধ ঢেকে রাখতে সক্ষম হন।

Advertisement

এই বাস্তবতা নতুন নয়। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের বহু শাসক, রাজা কিংবা ধর্মীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধেও শিশু নির্যাতন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের শোষণ কিংবা চরম যৌন বিকৃতির অভিযোগ রয়েছে। তখনকার দিনে আইন ও নৈতিকতার সংজ্ঞা ভিন্ন ছিল, কিন্তু অনেক ঘটনায় সমসাময়িক দলিল, চিঠিপত্র ও ইতিহাসবিদদের বিবরণ স্পষ্টভাবে অনৈতিক আচরণের দিকেই ইঙ্গিত করে।

পড়ুন: এপস্টেইন ফাইল কী? কেন এতো আলোচনায়

রোমান সম্রাট এলাগাবালুস: ক্ষমতা আর উন্মত্ততার মিশ্রণতৃতীয় শতকের রোমান সম্রাট এলাগাবালুস ইতিহাসে কুখ্যাত তার বেপরোয়া জীবনযাপনের জন্য। প্রাচীন ইতিহাসবিদ ক্যাসিয়াস ডিও ও হেরোডিয়ান তার শাসনকালকে নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাদের বিবরণে দেখা যায়, রাজপ্রাসাদে অল্পবয়সী কিশোরদের উপস্থিতি, যৌন পরিচয়ের সীমা ভাঙা আচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল নিয়মিত ঘটনা। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদরা কিছু বিবরণ অতিরঞ্জিত হতে পারে বলে সতর্ক করেন, তবুও একাধিক স্বাধীন সূত্রে তার বিকৃত লালসার উল্লেখ থাকায় বিষয়টি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Advertisement

পোপ বেনেডিক্ট নবম: ধর্মীয় ক্ষমতার কলঙ্কএকাদশ শতকের পোপ বেনেডিক্ট নবম ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একাধারে ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক শাসক। সমসাময়িক ধর্মীয় লেখকরা তাকে ‘নৈতিকভাবে কলুষিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে তিনি কিশোরদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতেন এবং পাপাল ক্ষমতা ব্যক্তিগত ভোগের জন্য ব্যবহার করতেন। চার্চ ইতিহাসে তিনি অন্যতম বিতর্কিত পোপ হিসেবে পরিচিত, যার আচরণ খোদ গির্জার ভেতরেই তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।

মধ্যযুগীয় ইউরোপের দরবার ও নীরবতামধ্যযুগে ইউরোপীয় রাজদরবার ছিল প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাজার ইচ্ছাধীন। অনেক ক্ষেত্রে রাজাকে প্রশ্ন করার সুযোগই ছিল না। কিছু শাসকের বিরুদ্ধে কিশোর বা অল্পবয়সী দাসদের যৌন শোষণের অভিযোগ পাওয়া যায় দরবারি নথি ও সমালোচনামূলক লেখায়। তবে সে সময় এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসত খুব কমই; রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া প্রায় কেউই মুখ খুলত না। ফলে অনেক ঘটনা ইতিহাসে শুধু ইঙ্গিত আকারেই থেকে গেছে।

পড়ুন: জেফরি এপস্টেইন: ধনকুবেরের মুখোশে ‘বিকৃত যৌনাচার’

রাজা চার্লস দ্বিতীয় (নেপলস ও সিসিলি): চার্চের তদন্ততেরো শতকের রাজা চার্লস দ্বিতীয়ের নাম উঠে আসে চার্চ-সংক্রান্ত কিছু তদন্ত নথিতে। সেখানে তার দরবারে অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতি ও অনৈতিক আচরণের অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। যদিও তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দণ্ডিত হননি, তবুও এই নথিগুলো দেখায় শাসকদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও ক্ষমতার দেয়ালে তা আটকে যেত।

Advertisement

পূর্বের রাজদরবার ও হারেম সংস্কৃতিইতিহাসের অন্য অঞ্চলেও, বিশেষ করে কিছু সাম্রাজ্যে, হারেম বা রাজকীয় অন্তঃপুর প্রথা ছিল। সেখানে অল্পবয়সী দাসী বা কিশোরীদের জোরপূর্বক আনা হতো যা আজকের চোখে স্পষ্টতই শিশু নির্যাতন। তখন এটিকে ‘প্রথা’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হলেও বাস্তবে তা ছিল ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার। বহু ইতিহাসবিদ এই প্রথাকে কাঠামোগত যৌন শোষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

কেন এসব অপরাধ চাপা পড়ত? এপস্টেইন কেস আমাদের শেখায় ক্ষমতা থাকলে অপরাধ গোপন করা সহজ। ইতিহাসেও একই চিত্র। আইনের অভাব বা পক্ষপাত: শাসক নিজেই আইন হওয়ায় বিচার অসম্ভব ছিল। ভয় ও নির্ভরতা: ভুক্তভোগীরা ছিল দরিদ্র, দাস বা নিম্নবর্গের তাদের কথা শোনার কেউ ছিল না। নৈতিকতার দ্বৈত মানদণ্ড: সাধারণ মানুষের জন্য এক নিয়ম, শাসকের জন্য আরেক।

আধুনিক যুগে পার্থক্য কোথায়? আজ আইন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ শক্তিশালী হলেও এপস্টেইন দেখিয়েছেন ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। তবে পার্থক্য এক জায়গায়: এখন ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর নথিভুক্ত হয়, ইতিহাসে লেখা থাকে। অতীতে যা গুজব বা ইঙ্গিত ছিল, আজ তা প্রমাণ ও সাক্ষ্যে রূপ নেয়।

আরও পড়ুনখালেদা জিয়াকে যেভাবে মনে রাখবে ইতিহাসইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তি

কেএসকে