মিনহাজুল মিনার একজন কলেজশিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই তার কৃষির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষে যুক্ত হন। পড়াশোনা শেষ করে যেন চাকরির পেছনে ছুটতে না হয়—এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কৃষিকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকায় সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন এই কলেজছাত্র।জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল থানার কোঁড়লগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের একমাত্র ছেলে মিনহাজুল মিনার। তিনি স্থানীয় একটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবাও একজন কৃষক। বাবার কাছ থেকেই কৃষির নানা অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি।মিনহাজুল মিনারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই তার কৃষিকাজের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়। তার বাবা শুধু ধান ও আলু চাষ করতেন। তবে মিনহাজুল শাকসবজি নিয়ে চাষাবাদ করার খুবই আগ্রহী। বয়স কম হওয়ার কারণে কৃষি কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে না এবং আর্থিক সাপোর্টও কম ছিল সব মিলিয়ে পরিবার তাকে এই কাজ করতে নিষেধ করেন। এরপরও মিনহাজুল তার মামার মাধ্যমে বাবাকে রাজি করিয়ে করলা চাষের মাধ্যমে কৃষিযাত্রা শুরু করেন মিনহাজুল। ধীরে ধীরে তার পরিশ্রম ও সফলতা দেখে তার বাবাও পাশে দাঁড়ান।বাবার সহযোগিতা পাওয়ার পর কৃষিকাজে তার গতি আরও বেড়ে যায়। নিজেদের জমির পরিমাণ কম হওয়ায় তাকে লিজ নিয়ে চাষ করতে হয়। তবে তার এলাকায় লিজের জমি সহজে পাওয়া যায় না, আর মিললেও ভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশ চড়া।তিনি মৌসুম ও আগাম দুভাবেই বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদন করেন। বর্তমানে মিনহাজুল তিন একর জমিতে চাষাবাদ করছেন। এর মধ্যে দুই একর জমিতে রয়েছে আলুর আবাদ এবং ৬৫ শতাংশ জমিতে শশা ও করলা। এ তরুণ মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করেন, ফলে ফলন ভালো হয় এবং উৎপাদিত ফসলের গুণগত মানও উন্নত থাকে। এতে বাজারে পণ্য ভালো দামে বিক্রি করা যায়।
Advertisement
প্রতি মৌসুম শেষে সব খরচ বাদ দিয়ে মিনহাজুলের হাতে মোটা অঙ্কের লাভ থাকে। গত বছরে মোট বার্ষিক আয় হয়েছিল ১০ লাখ টাকারও বেশি, যেখানে খরচ বাদে ৫ লাখ টাকা লাভ হয়। ফলন ভালো হলে এবং বাজারদর অনুকূলে থাকলে আয় আরও বেশি হয়। কৃষিকাজের মাধ্যমেই তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এসেছে।কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিতে যুক্ত হওয়ার কারণে একসময় এলাকার কিছু মানুষ ও সহপাঠীদের কাছ থেকে তাকে কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে। অনেকেই তার এই কাজকে নেতিবাচকভাবে দেখতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সাফল্যই সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। বর্তমানে কৃষিতে সফলভাবে এগিয়ে যাওয়ার কারণে সেই মানুষগুলোর কাছ থেকেই এই শিক্ষার্থী প্রশংসা কুড়াচ্ছেন।মিনহাজুল জানান, কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে তিনি কখনোই চাকরিনির্ভর জীবন চাননি। তার মতে, পড়াশোনা হলো নিজের ব্যক্তিগত একাডেমিক ও নৈতিক অর্জন। পড়াশোনা করলেই যে চাকরি করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।তিনি মনে করেন, ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হওয়াতেই তার দক্ষতা বেশি কাজে লাগবে। কৃষি খাতে তার আগ্রহ ও স্কিল ভালো হওয়ায় তিনি বিশ্বাস করেন, এই পেশার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করা সম্ভব এবং একইসঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখা যাবে।তিনি আরও বলেন, বাবা মূলত ধান ও আলু চাষ করতেন। কিন্তু আমার ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল সবজি চাষ করার। পরিবার এসব কাজে রাজি ছিল না। তবে যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি মামার সহযোগিতায় বাবাকে বুঝিয়ে প্রথমবারের মতো কৃষিকাজ শুরু করি। বাবার লিজ নেওয়া জমিতে যেখানে ধান চাষ হতো, সেখানেই করলা চাষের মাধ্যমে সবজি চাষ শুরু করি।এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, পরবর্তীতে পরিবার আমাকে রাজশাহী সরকারি শহীদ কামরুজ্জামান কলেজে ইন্টার প্রথম বর্ষে ভর্তি করায়। এ সময় করলা চাষের প্রকল্পটি চলমান ছিল, কিন্তু পড়াশোনার কারণে তা রেখে শহরে চলে যেতে হয়। তবে সেখানে আমার মন বসেনি। কৃষি ও নিজের কাজের প্রতি টান থেকেই আবার গ্রামে ফিরে আসি এবং এলাকার কলেজে ভর্তি হই। এরপর থেকে আরও মনোযোগ দিয়ে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত হই। বর্তমানে পরিবারও আমাকে পুরোপুরি সমর্থন দিচ্ছে।এই কলেজছাত্র জানান, বর্তমানে তিনি আলু, করলা ও শসা চাষ করছেন। সামনে জুন-জুলাই মাসে বেগুন, পটল, লাউ ও মরিচ চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের জমিতে ইরি মৌসুমে ধান চাষ করা হবে।
আয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে এই উদ্যোক্তা বলেন, বছর শেষে আলহামদুলিল্লাহ ভালো আয় হয়। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো পরিবার ও এলাকাবাসীর মন জয় করতে পারা।তিনি বিশ্বাস করেন, একটা সময় দুই-চারজন সরকারি চাকরিজীবী মিলেও তার সঙ্গে আর্থিকভাবে টিকতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। এই কৃষিকাজ দিয়েই তার সংসার ভালোভাবে চলছে এবং ভবিষ্যতের জন্য পুঁজিও তৈরি হচ্ছে।কলেজছাত্র আরও জানান, শুরুতে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে তিনি খুব একটা ভালো করতে পারতেন না। তবে ‘কৃষকের প্রাণ কৃষি পরিবার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি নিয়মিত পরামর্শ পাচ্ছেন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ছবি তুলে সেখানে পোস্ট করলেই গ্রুপে থাকা অভিজ্ঞ চাষিরা পরামর্শ দেন। এতে চাষাবাদ সম্পর্কে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেক বেড়েছে।শিক্ষার্থী হিসেবে এই পর্যায়ে আসা মোটেও সহজ ছিল না বলে তিনি জানান। ভালো কলেজ বা ভালো শহরে না থেকে গ্রামে ফিরে এসে কৃষিকাজ করা—এটা অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলতো, 'বাপ যা করছে ছেলেও তাই করছে, তাহলে পড়াশোনা করে লাভ কী?' তবে মিনহাজুল এসব কথাকে কখনোই গায়ে লাগাননি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই উদ্যোক্তা বলেন, পড়াশোনা শেষ করে কৃষিকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে চাই। এলাকায় লিজ জমি পাওয়া কঠিন হলেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে যতটুকু জমি আছে, তার মধ্যেই সিজনে নতুন নতুন সবজি যুক্ত করার চেষ্টা করছি। এ বছর থেকেই বেগুন, মরিচ, লাউ, পেঁয়াজ ও চিচিঙ্গা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আধুনিক চারা উৎপাদনের জন্য একটি নার্সারি এবং গবাদিপশুর খামার করারও ইচ্ছা আছে। সেখানে এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।সবশেষে এই কলেজছাত্র বলেন, তার জন্য সবাই যেন দোয়া করেন—তিনি যেন কৃষিতে ভালো কিছু করতে পারেন। তার বিশ্বাস দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষিতে শিক্ষিত তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দেশ আরও এগিয়ে যাবে।অল্প বয়সে সাহস, পরিশ্রম ও আধুনিক চিন্তাধারার মাধ্যমে কৃষিকে বেছে নিয়ে মিনহাজুল মিনার আজ অনেক বেকার তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
Advertisement
এমআইএইচ