নারীদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর বড় একটি অংশ আসে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার থেকে। আশঙ্কার বিষয় হলো এই দুই ধরনের ক্যানসারই অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিন্তু সচেতনতার অভাব, নিয়মিত পরীক্ষা না করা এবং সামাজিক সংকোচের কারণে অধিকাংশ নারী রোগ শনাক্ত করেন দেরিতে। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে এবং ঝুঁকি বেড়ে যায়।
Advertisement
নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কোন পরীক্ষাগুলো নিয়মিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের ক্যানসার এপিডেমিওলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন।
স্তন ক্যানসার নীরবে বাড়ে, দেরিতে ধরা পড়েস্তন ক্যানসার বর্তমানে বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসারগুলোর একটি। শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই এর হার বাড়ছে। অনেক সময় কোনো ব্যথা বা স্পষ্ট উপসর্গ না থাকায় নারীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
অধ্যাপক ডা. রাস্কিন বলেন, ‘স্তন ক্যানসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নারীরা লক্ষণ বুঝতে পারেন দেরিতে। অথচ নিয়মিত কিছু পরীক্ষা করলে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ ধরা সম্ভব’। স্তন ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো হচ্ছে-
Advertisement
এটি সবচেয়ে সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস। ২০ বছর বয়সের পর থেকে প্রতি মাসে একবার করা উচিত। মাসিক শেষ হওয়ার ৭–১০ দিনের মধ্যে করা সবচেয়ে উপযোগী। স্তনে কোনো গাঁট, শক্ত ভাব, আকার পরিবর্তন, ত্বকের রঙ পরিবর্তন বা নিঃসরণ হচ্ছে কি না সেগুলো খেয়াল করতে হবে।
ডা. রাস্কিনের মতে, নিজের শরীর নিজে চেনাই স্তন ক্যানসার প্রতিরোধের প্রথম ধাপ।
ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশনপ্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা নার্স দ্বারা স্তন পরীক্ষা। ৩০ বছরের পর থেকে বছরে অন্তত একবার। ঝুঁকি থাকলে আরও ঘন ঘন।
ম্যামোগ্রামস্তনের এক্স-রে পরীক্ষা, যা ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে পারে। সাধারণভাবে ৪০ বছর বয়সের পর। পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে আগেই শুরু করা প্রয়োজন।
Advertisement
জরায়ুমুখ ক্যানসার মূলত ভাইরাসজনিত একটি ক্যানসার, যার প্রধান কারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ। এই ক্যানসার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং প্রাথমিক অবস্থায় প্রায় কোনো লক্ষণ থাকে না।
অধ্যাপক ডা. রাস্কিন বলেন, ‘জরায়ুমুখ ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা নিয়মিত স্ক্রিনিং করলে প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।’ জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে জরুরি পরীক্ষাগুলো হচ্ছে-
ভিআইএ পরীক্ষা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ স্ক্রিনিং পদ্ধতি। ৩০ বছর বয়সের পর প্রতি ৩–৫ বছর অন্তর। সরকারি হাসপাতাল ও মাতৃসদনে বিনা খরচে পাওয়া যায়। দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায়।
প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট: জরায়ুমুখের কোষ পরীক্ষা করে ক্যানসার বা ক্যানসার-পূর্ব অবস্থান শনাক্ত করা হয়। ২১ বছর বয়সের পর শুরু করা যেতে পারে। ৩ বছর অন্তর করা নিরাপদ।
এইচপিভি টেস্ট: এইচপিভি ভাইরাস আছে কি না তা শনাক্ত করে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য কার্যকর। প্যাপ স্মিয়ারের সঙ্গে করলে নির্ভুলতা বাড়ে।
ডা. রাস্কিনের মতে, কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে যেমন- পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস, বাল্যবিয়ে ও কম বয়সে সন্তান ধারণ, একাধিকবার গর্ভধারণ, দীর্ঘদিন হরমোনজনিত ওষুধ সেবন, ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
সচেতনতা ও নিয়মিত পরীক্ষাই মূল চাবিকাঠিএই দুই ধরনের ক্যানসারই এমন, যেগুলোর ক্ষেত্রে ‘আগে জানলে বাঁচা যায়’ কথাটি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। অথচ সামাজিক লজ্জা, ভয় বা ভুল ধারণার কারণে অনেক নারী পরীক্ষা করাতে চান না।
অধ্যাপক ডা. রাস্কিন জোর দিয়ে বলেন, নারীদের বুঝতে হবে পরীক্ষা করানো কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি নিজের জীবন রক্ষার দায়িত্ব।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকানারীর স্বাস্থ্য শুধু নারীর একার বিষয় নয়। পরিবার, স্বামী ও সমাজকে সহযোগিতামূলক হতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা করাতে উৎসাহ দেওয়া, সময় দেওয়া এবং মানসিক সমর্থন দেওয়াই পারে বহু প্রাণ বাঁচাতে।
সবশেষে ডা. রাস্কিন আরও বলেন, স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার ভয়ংকর হলেও অজেয় নয়। নিয়মিত পরীক্ষা, সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই পারে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমাতে। আজ একটু সচেতন হলেই আগামীর বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। কারণ নিজের যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
জেএস/