প্রাচীন গ্রামবাংলার অন্যতম উৎসব বাংলা নববর্ষ কিংবা পহেলা বৈশাখ। বাংলা বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মেলবন্ধন দৃঢ় রাখতে উভয় পক্ষের মধ্যে মিষ্টিমুখ করানো বাংলার আবহমান ঐতিহ্য। ফলে পহেলা বৈশাখ ঘিরে প্রতিবছরই ব্যস্ততা বাড়ে সনাতন ধর্মালম্বী ঘোষ সম্প্রদায়ের মিষ্টি কারিগর ও ব্যবসায়ীদের।
Advertisement
বিশেষ করে যুগ যুগ ধরে প্রাচীন বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জের ঐতিহবাহী সুস্বাদু ও মুখরাচর মিষ্টির সুনাম এবং খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। ২০২৫ সালের (১৫ বৈশাখ) সিরাজদিখাঁনের সন্তোষ পাড়ার প্রাচীন কলা পাতার পাতক্ষীর পেয়েছে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি।
বাংলা নববর্ষ ঘিরে ক্রেতা আপ্যায়নের জন্য দূরদূরান্ত থেকে পাইকারক বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায় এ অঞ্চলে। বিভিন্ন স্থানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ চালের আড়তে দেখা গেছে সাজসজ্জায়, পোশাক, খাওয়া-দাওয়া সহ সবকিছুতেই বৈশাখের আমেজ। বৈশাখী আমন্ত্রণপত্রে সাধারণ ক্রেতা ও পাইকারদের মিষ্টিমুখ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে মঙ্গলবার সকালে একাধিক মিষ্টির আড়ত ও মিষ্টি তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে বাহারি ডিজাইন ও রংয়ের লালমোহন ও খিলমোহনসহ প্রায় ২শ/৩শ কেজি সাদা রসগোল্লা তৈরি করেছেন কারিগররা। মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাড়তি চাহিদা মেটাতে লালমোহন ও সাদা রসগোল্লা-এ দুই ধরনের মিষ্টি বেশি তৈরি করেন কারিগরা।
Advertisement
এদিকে বৈশাখীর খাবারেও প্রতিবছরই থাকে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। বাঙালির প্রিয় ভাত, ভর্তা আর ইলিশ মাছ তো থাকেই। গ্রামবাংলার মেলায় দেখা মেলে মিঠা কদমা, চিনি বালুসা, লালমোহন, খিলমোহন, সাদা বালুসা, বাতাসা, মুরলি, খাগড়াই, নিমকিসহ আরো নানান রকম মুখরোচক খাবার।
গ্রাম ছাড়িয়ে এসব মিষ্টির দেখা মেলে শহুরে জীবনেও। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় পাওয়া যায় এসব খাবার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৈশাখের আগমনে দেশজুড়ে এসব মিঠাইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে গ্রামবাংলার লোকজ এসব খাবার প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত সময় পার করেন কারিগররা।
লাল মোহন ও খিল মোহনলাল মোহন ও খিল মোহন দুটিই খেতে মিষ্টি। আকৃতির দিক থেকেও এদের মধ্যে পার্থক্য নেই। তবে স্বাদে ও রঙে কিছুটা পার্থক্য আছে বটে। বাঙালির প্রিয় লাল মোহন তৈরি হয় খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে তেলে ভেজে। খুব ঘন করে চিনি জ্বাল দিয়ে এরপর ভিজিয়ে রাখা হয় মিষ্টি লালমোহন। সাদা রঙের গোল আকৃতির হয় খিল মোহন, আর আকারে অনেক ছোট হয়। এটিও চিনি খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে তৈরি। তবে এর ভেতরে থাকে খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষিরার মাওয়া।
সাদা রসগোল্লাসাদা রসগোল্লা নাম শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়, পাতলা শিরায় ভেজানো মিষ্টি দেখলেই জিভে জল এসে যায়। সাদা রসগোল্লাও তৈরি হয় খাঁটি গরুর দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে। প্রথমে খাঁটি গরুর দুধ থেকে তৈরি করা হয় ছানা এরপর চিনি জ্বাল দিয়ে শিরা তৈরি করা হয়। এরপর সেই শিরায় দীর্ঘ সময় সেদ্ধ করে তৈরি করা হয় সাদা রসগোল্লা। বাংলায় অনেক পুরোনো মিষ্টির মধ্যে সাদা রসগোল্লা অন্যতম। অতিথি আপ্যায়নে সাদা রসগোল্লা দেওয়া পুরোনো রীতি। পরিবারের আয়োজনে বা অতিথির আপ্যায়নে বৈশাখীর আয়োজন মানেই সাদা রসগোল্লা থাকবেই।
Advertisement
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,পহেলা বৈশাখের সাদা রসগোল্লা অনেকটা ছোট গোল আকারের হয়। বাইরে দেখতে কিছুটা শক্ত মনে হলেও ভেতরটা থাকে তুলতুলে নরম। ওপর ও নিচের আকৃতি অনেকটাই কমলালেবুর মতো গোল। মূলত খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে তৈরি হয় এটি।
বাড়িতে যদি সাদা রসগোল্লা তৈরি করতে চান তাহলে প্রথমে খাঁটি দুধ থেকে ছানা তৈরি করতে হবে, এরপর সেই ছানা শুকনো করে, কিছুটা সুজি মিশিয়ে, গোলাকৃতির করে কেটে নিতে হবে, এরপর পানিতে চিনি দিয়ে ফোটাতে হবে। এরপর ঠান্ডা করে চিনি জমাট বাঁধলে ছড়ানো পাত্রে অল্প আইসিং সুগার ছিটিয়ে শিরা ঢেলে অল্প গরম থাকা অবস্থায় রোল করে গারো শিরার মাঝে ডুবিয়ে রাখতে হয়। কয়েকবার করলেই ভেতরটা কিছুটা ফাঁপানো হয়ে যায় তখন এরপর বাতাসে রেখে একদম ঠান্ডা করে নিলেই হয়ে যাবে সুস্বাদু রসগোল্লা।
চিনির তৈরি বালুসাবৈশাখী মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ চিনির তৈরি বালুসা মিষ্টি, হাতি-ঘোড়া, মটক, পাখি ও নৌকা। পহেলা বৈশাখে থাকে মুন্সিগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্য এই খাবার। বৈশাখ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত মেলায় চিনির তৈরি বালুসা অথবা দানাদার মিষ্টি সহ হাতি-ঘোড়ার দেখা মিলবে।
বৈশাখী মেলায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে চিনি ও খাঁটি দুধের ছানা থেকে তৈরি দানাদার বালুসা
স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, বৈশাখী আগমনী বার্তায় কারিগররা প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খাঁটি গরুর দুধের ছানা ও চিনির তৈরি এসব খাবার প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করেন। খাবারটি তৈরি হয় শুধু ছানা ও চিনি দিয়েই। প্রথমে বিশেষভাবে তৈরি করা পাতিলে চিনি জ্বাল দেওয়া হয়। চিনির সিরা তৈরি হলে গরম অবস্থায় সেটি কাঠের ফ্রেমে ঢালা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ছোট ছোট গোলাকৃতির মিষ্টি তৈরি করে সেগুলো চিনি মাখনো হয় পরে তৈরি হয়ে যায় সুস্বাদু দানাদার বালুসা মিষ্টি।
নিমকিবৈশাখীর মেলাজুড়ে মিষ্টি পদে পাশে থাকে নোনতা নিমকিও। যারা মিষ্টি কম পছন্দ করেন নিমকি তাদেরই বেশি পছন্দের খাবার। নিমকি মিষ্টি ও নোনতা দুই স্বাদেই পাওয়া যায়। তবে নোনতা নিমকির চাহিদা একটু বেশিই থাকে। মিষ্টির কারিগররা জানিয়েছেন, নিমকি বানাতে প্রথমে একটি পাত্রে ময়দা, কালিজিরা, জোয়ান, লবণ ও পরিমাণমতো ঘি দিয়ে ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। সামান্য পানি দিয়ে মাখিয়ে রাখতে হবে ৩০ মিনিটের জন্য। এরপর ময়দার মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে বেলে নিতে হবে। ছুরি দিয়ে ছোট ছোট নিমকি আকারে কেটে কড়াইয়ে গরম তেলে ভেজে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে নিমকি। আরও পড়ুননববর্ষ ও বর্ষ গণনার একাল-সেকালচৈত্রসংক্রান্তি: মর্মান্তিক ইতিহাস-হারিয়ে যাওয়া বাংলার উৎসব
শুভ ঘোষ/কেএসকে/এমএস