নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে রীতিমতো ত্যাক্ত বিরক্ত সেবা গ্রহীতারা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দখলে রেখে নিয়মিত মানুষকে হয়রানি করে যাচ্ছে চক্রটি। শুধু সেবা প্রত্যাশীরাই নয়, খোদ কমপ্লেক্সের দায়িত্বে নিয়োজিত স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও দালালের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ বলে জাগো নিউজের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।
Advertisement
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে বিভিন্ন অসুস্থ রোগী এবং তাদের স্বজনদের হয়রানির দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখা গেছে, যেকোনো অসুস্থ রোগী হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পা রাখা মাত্রই ওইসব রোগীদের আশপাশে ভিড় জমান একদল দালাল। বিশেষ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর রোগবালাই যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষা দিলে রোগী কিংবা তাদের স্বজনরা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্রই হাত থেকে কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা ক্লিনিকে নিয়ে যায়। আর এই চক্রের সঙ্গে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সরাসরি যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
জানা গেছে, যেকোনো সরকারি হাসপাতালের ৫০০ গজের মধ্যে কোনো বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা ক্লিনিক থাকার অনুমতি নেই। অথচ উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতাল ঘেঁষে অর্থাৎ ১০০ গজের ভেতর সোনারগাঁ মর্ডান হাসপাতাল, নিরাময় ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং সোনারগাঁ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামক তিনটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক রয়েছে। আর এই তিন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন নারী-পুরুষ মিলিয়ে অন্তত ১৫ জন দালাল। তারা দিবারাত্রি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা মানুষকে হয়রানির মাধ্যমে এই তিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রোগী সাপ্লাই দেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও স্থানীয়ের বরাতে জানা যায়, দালাল চক্র থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশ কয়েকবার অবগত করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান শুরুর আগেই লোক মারফত খবর পেয়ে সংঘবদ্ধ দালালরা সচেতনতা অবলম্বন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিতে রোগীর ছদ্মবেশে দালালি কার্যক্রম চালায়।
Advertisement
এদিকে দালালদের সঙ্গে হাসপাতালটির কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। তবে বিষয়টি তারা অস্বীকার করেছেন। তেমনই একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান দিগন্ত।
তিনি বলেন, কোনো দালালের সঙ্গে যোগসাজশ তো দূরের কথা, উল্টো আমরা দালালদের বিরুদ্ধে থাকায় আমার বিরুদ্ধে কিছুসংখ্যক মানুষ এই মিথ্যাচার করছে। বিশেষ করে সম্প্রতি সময়ে বিভিন্ন অভিযান শুরু করায় কিছু কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিকের লোকজন আমাদের বিরুদ্ধে একরকম কথাবার্তা বলছে। আমাদের সরকারি কোনো কর্মকর্তা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। তাছাড়া সোনারগাঁয়ের কিছু অসাধু সাংবাদিকও আছে যারা এসব মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। তারা বলে থাকে আমাদের সঙ্গে দালালদের সম্পর্কে রয়েছে। কিন্তু এটা মিথ্যা।
জাহাঙ্গীর হোসেন নামক আরেক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সোনারগাঁ থেকে বদলি হয়ে গেছেন বলে জানান। বলেন, আমার সঙ্গে সোনারগাঁয়ের কোনো ক্লিনিকের যোগাযোগ নেই। আমি বদলি হয়েছি।
আয়েশা খাতুন নামের এক নারী তার মাকে ডাক্তার দেখাতে এসে হয়রানির শিকার হয়েছেন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি আগে থেকেই দালালদের বিষয়টি অবগত। তাই আমাকে অনেক ফোর্স করা হলেও আমি তাদের কথা অনুযায়ী বাইরে কোনো টেস্ট করিনি। আনুমানিক ২৯-৩০ বছর বয়সী একটা ছেলে অনেকক্ষণ আমার পেছন পেছন ঘুরেছেন। মূলত রোগীরা সুস্থ হতে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে দালালদের দ্বারা হয়রানি হয়ে উল্টো আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যায়। এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
Advertisement
দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুমাইয়া ইয়াকুব জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। এদের যন্ত্রণায় আমরা প্রশাসনে কয়েকবার অভিযোগ করেছি। এটা দুঃখজনক। কোনো কোনো ক্ষেত্রেতো দালালরা নিজেরাই রোগীর ছদ্মবেশ ধারণা করে হাসপাতালে ঘোরাফেরা করে। তবে আমাদের কোনো কর্মকর্তা এদের প্রশ্রয় দেয় না। মূলত এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত জানান, দালালদের দৌরাত্ম্যের ব্যাপারটা আমি ইতোঃপূর্বে একবার শুনেছি। আমাদের এমপি মহোদয়ও এটি সম্ভবত অবগত। আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থ গ্রহণ করবো।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এএফএম মুশিউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, দালালদের দৌরাত্মের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে আমরা এটা দেখবো।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০০ গজের আশপাশে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকা যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুমোদিত যেকোনো ডায়াগনস্টিক ৫০০ গজ না, যেকোনো জায়গায় হতে পারে। এটাতে কোনো বিধিনিষেধ নেই।
মো. আকাশ/এফএ/এমএস