• রেলের ৯০০ স্টাফ কোয়ার্টারের মধ্যে ৭০০ কোয়ার্টারই বেদখলে• এসব ভবনের ভাড়া বাবদ কোনো অর্থই যায় না সরকারি কোষাগারে• ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনে যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা • বেদখলে থাকা কোয়ার্টারে নিয়মিত বসে মাদকের আসর
Advertisement
লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের ৭০০ আবাসিক কোয়ার্টার এখন বেদখল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের ছাদ এবং দেওয়ালে ফাটল, জানালা-দরজা নেই, পাকা ছাদ বিধ্বস্ত, ইটের ফাঁকে ফাঁকে আগাছা। দেখে মনে হয় ভূতুড়ে বাড়ি। তারপরও কিছু কোয়ার্টারে অবৈধভাবে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে দখলদাররা। রাতে চলে বেআইনি কাজ, বসে মাদকের হাট।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো ৭০০ আবাসিক কোয়ার্টারগুলোর মধ্যে কিছু কোয়ার্টারে অবৈধভাবে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে দখলদাররা। ১৯৩০ সালে নির্মাণ করা হয় লালমনিরহাট রেলওয়ের এসব কোয়ার্টার। অধিকাংশ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক কোয়ার্টারে সন্ধ্যা হলে মাদকের আসরও বসে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
একসময় রেলের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল লালমনিরহাট। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য শহরের প্রাণকেন্দ্র স্টোরপাড়া, ড্রাইভারপাড়া, রামকৃষ্ণ মোড়, বাবুপাড়া, শিশুপার্ক এলাকা, সাহেবপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছিল সহস্রাধিক স্টাফ কোয়ার্টার। প্রায় শত বছর আগের নির্মিত এসব কোয়ার্টার সংস্কারের অভাবে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে রেল কর্তৃপক্ষের কেউ বসবাস না করলেও প্রায় ৪০ বছর ধরে অবৈধ দখলদাররা অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই বসবাস করছে। আবাসিক কোয়ার্টারগুলোতে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মুহুরী, মুদি দোকানদার, বাস-ট্রাকের চালক, হেলপার, হকার, এনজিও কর্মী, শ্রমিক ও দিনমজুররা বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছেন।
Advertisement
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা রেল কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অলিখিতভাবে কোয়ার্টারগুলো মাসিক ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। যার ভাড়ার টাকা কোনোদিনই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।
‘রেল কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অলিখিতভাবে কোয়ার্টারগুলো মাসিক ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। যার ভাড়ার টাকা কোনোদিনই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।’
এদিকে শহরের বেশিরভাগ এলাকা রেলের আওতায় থাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ছে পৌরসভা। এতে উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শহরবাসী।
আরও পড়ুন- আয়ুষ্কাল শেষ ৫ দশক আগে, মরিচা ধরা লাইনেই চলছে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগজনবল সংকটে বিপর্যস্ত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে, বন্ধ ৪৩ ট্রেন-৬৭ স্টেশনশতবর্ষী সিলেট-আখাউড়া রেলপথে দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী
Advertisement
স্থানীয়রা জানান, শুধু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ আবাসিক কোয়ার্টারের এ অবস্থা। লালমনিরহাটে এমন আবাসিক কোয়ার্টারের সংখ্যা ৯১০টি হলেও প্রায় ৭ শতাধিক কোয়ার্টার বেদখলে। পুরোনো এবং জীর্ণ অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। আর যেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলোর ওপর নজর নেই।
রেলস্টেশন সূত্র জানায়, লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটে জেলার সীমানা জুড়ে ১২টি স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশন সংলগ্ন আবাসিক কোয়ার্টারের স্টেশন মাস্টারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসবাসের জন্য রেল বিভাগের রয়েছে অনেক আবাসিক কোয়ার্টার। বর্তমানে যেগুলোর অধিকাংশই রয়েছে বহিরাগতদের দখলে। লাল রঙের এই ভবনগুলো ব্রিটিশ আমলে তৈরি। এখন জীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই ভবনগুলোতে রেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা না থাকায় যে যার মতো দখল করে রেখেছে। এসব ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই বসবাস করছেন বহিরাগতরা। সেইসঙ্গে চুরি হয়ে যাচ্ছে ভবনের ইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। বহিরাগতদের দখলে থাকা এসব আবাসিক কোয়ার্টারে মাদক ব্যবসাসহ নানান অনৈতিক কাজের অভিযোগ অনেক পুরোনো হলেও দেখার কেউ নেই।
‘রেলের এই পরিত্যক্ত ভবনটি মডেল মসজিদের পাশে। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে হলেও রাতে এখানে মাদকের আড্ডা বসে। রাতে স্থানীয় মানুষজন এর পাশ দিয়ে চলাচল করতে খুবই ভয় পায়। আমরা চাই দ্রুত সরকার ও রেল কর্তৃপক্ষ এসব ভবন নিয়ে সুস্থ সমাধান করবেন।’
বিএনপি কলোনির স্থায়ী বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম একটি ভবন দেখিয়ে বলেন, আমার পেছনে যে ভবনটি দেখছেন, শুনেছিলাম এটি নাকি নিলাম হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এটা ভাঙছে না। রাত হলেই এখানে নেশাখোরদের আড্ডা বসে। এমনিতেই কোনো ধরনের বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, রাত হলে এই জায়গাটি ভূতুড়ে হয়ে ওঠে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আনিসুল ইসলাম বলেন, রেলের এই পরিত্যক্ত ভবনটি মডেল মসজিদের পাশে। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে হলেও রাতে এখানে মাদকের আড্ডা বসে। রাতে স্থানীয় মানুষজন এর পাশ দিয়ে চলাচল করতে খুবই ভয় পায়। আমরা চাই দ্রুত সরকার ও রেল কর্তৃপক্ষ এসব ভবন নিয়ে সুস্থ সমাধান করবেন।
অপরদিকে বহিরাগতদের বারবার উচ্ছেদ করা হলেও বেদখল হওয়া কোয়ার্টারগুলো দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্মকর্তা।
লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খান বলেন, রেলওয়ের জমি ও আবাসিক কোয়ার্টারগুলো দখলমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। বিধ্বস্ত কোয়ার্টারগুলো মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি এই ভবনের সঠিক তদারকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নতুন ভবন নির্মাণ করবে কর্তৃপক্ষ- এমনটিই প্রত্যাশা তার।
এফএ/এমএস