জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ইমাম হাসান তাইমের বাবা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতকে তিনি বলেছেন, তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে পুলিশের ছোড়া গুলির তথ্য গোপন করা হয়েছে। তবে নিজের চাকরি হারানোর চিন্তা থেকে ছেলের সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
Advertisement
মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষী হিসেবে বুধবার (১৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেলে জবানবন্দি দেন ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ এপ্রিল দিন ঠিক করেন আদালত।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার ও মঈনুল করিমসহ অন্যরা। সাক্ষী বর্তমানে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে এসআই হিসেবে কর্মরত। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশ।
জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সকালে পরিবারের সদস্য-সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অবস্থান করি আমি। তাইমের মরদেহ সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়। এর মধ্যেই আমার সঙ্গে দেখা করেন শাহবাগ থানার এসআই শাহাদাত। তখন পরিচয় দিয়ে তাইমকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে বলে জানাই। একইসঙ্গে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার কথা বলি। কিন্তু একই পেশার সহকর্মী হিসেবে কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে আরেকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি।
Advertisement
তাইমের বাবা বলেন, সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলেও অকারণে দেরি করতে থাকেন শাহাদাত। দুপুর ১২টার দিকে সুরতহাল করতে যান তিনি। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন।’ জবাবে এসআই শাহাদাত বলেন ‘এটা ওপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারবো না।’
সাক্ষী আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে’—এই কথা বলে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। এতে আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই।
ময়নাল হোসেন বলেন, ‘গুলিতে আমার ছেলে মারা গেছে। চাকরি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। মরদেহে প্রায় পচন ধরে গেছে—এসব চিন্তা করে সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। সুরতহাল শেষে প্রায় দু-তিন ঘণ্টা পার হলেও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এনিয়ে এসআই শাহাদাতের কাছে বারবার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি। বিকেল ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। সাড়ে ৪টার পর সম্পন্ন হলে আমরা তাইমের মরদেহ বুঝে পাই।’
এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগরে রয়েছেন দুজন। তাদের আজ সকালে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন—যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।
Advertisement
পলাতকরা হলেন—ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।
এফএইচ/এমএমকে