দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ গণমাধ্যমে তাদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছে। ১৫ জেলায় ১৫৪ জন প্রান্তিক মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা চান গণমাধ্যমে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
Advertisement
‘জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর জোরালো করা: নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত সেমিনারে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে ক্রিশ্চিয়ান এইড বাস্তবায়িত ইসিএসএপি প্রকল্পের আওতায় এ সেমিনারের আয়োজন করে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৬১ শতাংশ প্রান্তিক মানুষ গণমাধ্যমে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন এবং ৫৯ শতাংশ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ৫১ শতাংশ মনে করেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির বিষয়গুলো আরও বেশি করে তুলে ধরা প্রয়োজন।
Advertisement
অন্যদিকে, মাত্র ২১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন ইতিবাচক উদ্যোগ ও সাফল্যের গল্প তুলনামূলক কম প্রচার পায়। ৫ শতাংশ গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছেন।
গবেষণার সুপারিশে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত যোগাযোগ ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ৪২ শতাংশ প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের কথা বলেছেন। ৪৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শক্তিশালী অ্যাডভোকেসির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া ২৪ শতাংশ সেবা বা আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। ১৭ শতাংশ মিডিয়ার সঙ্গে সংযোগ ও প্রমাণভিত্তিক উপস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন এবং ১৪ শতাংশ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা গণমাধ্যমে আরও ঘন ঘন কভারেজ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে এবং তাদের বাস্তব অবস্থা জানতে এ ধরনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Advertisement
আরও পড়ুনতিন ধরনের ‘যুদ্ধ’ মোকাবিলা করছে দেশ: পানিসম্পদমন্ত্রী অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর করোনাকালীন অনুদান দুজনের পকেটে
তিনি বলেন, এখন তথ্যই অর্থ। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ সম্ভব। এজন্য উন্নয়ন সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন প্রয়োজন।
ফারজানা শারমিন আরও বলেন, দীর্ঘদিন অনেক মানুষ কথা বলার সুযোগ পায়নি এবং দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তা স্বাভাবিক বলে মনে হতো। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পিছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার লায়লা জাসমিন বানু বলেন, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে গণমাধ্যমকর্মীদের আরও সচেতন ও সংবেদনশীল হতে হবে।
ইউনেসকো বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইস বলেন, বর্তমানে মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কমিউনিটি রেডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় মূলধারার গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ক্রিশ্চিয়ান এইডের প্রতিনিধি নুজহাত জাবিন বলেন, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের বিষয়গুলো যথাযথভাবে উঠে আসে না।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, চর্চা ডট কমের সম্পাদক সোহরাব হাসান এবং ‘আমরাই পারি’ জোটের নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক।
বক্তারা নাগরিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে জনপরিসরে উঠে আসে এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।
সেমিনারের শেষে গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নে অংশীজনদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
এসইউজে/কেএসআর