স্বদেশনির্ভর চিনিশিল্প গড়তে বন্ধ চিনিকল পুনরায় চালু করতে চায় শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা, ওইসব লোকসানি মিল নতুন করে চালু করার পক্ষে নয় অর্থ মন্ত্রণালয়। যে কারণে এ পর্যন্ত কয়েক দফা মিল চালুর জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হলেও তাতে অসম্মতি জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ‘বন্ধ চিনিকল চালুকরণ টাস্কফোর্স কমিটি’র সুপারিশের পরও টাকা ছাড় হচ্ছে না। ফলে বন্ধ চিনিকল চালুর উদ্যোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
Advertisement
ছয়টি বন্ধ মিল চালু হচ্ছে না২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর ২১টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেগুলো ছিল—শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকল। এরপর থেকে প্রতিবছর সেগুলো চালু করতে নানান দাবি ও কর্মসূচি দিয়ে আসছে বন্ধ মিলগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীসহ দেশীয় চিনিশিল্প রক্ষার সঙ্গে সহমত পোষণ করা সংগঠনগুলো।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে বন্ধ চিনিকল চালুকরণ টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করেছিল। এ কমিটি বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দেওয়া ও নতুন করে জনবল নিয়োগের একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেয় ওই বছরের ডিসেম্বরে।
তখন তিন ধাপে ছয়টি চিনিকল চালু করতে বলা হয়। এরজন্য অর্থছাড় করতে সুপারিশ করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়কে। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশও তুলে নেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)।
Advertisement
প্রথম ধাপে দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ ও রংপুরের শ্যামপুর চালুর উদ্যোগ নেয় বিএসএফআইসি। কিন্তু বাধ সাধে অর্থ। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেতাবগঞ্জ ও রংপুরের জন্য যথাক্রমে ৮২৩ কোটি ও ৫৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে দুবার চিঠি দিয়ে ব্যর্থ হয় শিল্প মন্ত্রণালয়। শেষ দফায় গত জানুয়ারিতে চিঠি দেওয়া হলেও আবারও অসম্মতি জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এসব ক্ষেত্রে টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তও আমলে নেয়নি অর্থবিভাগ।
বরাদ্দ ছাড়া মিল চালু নয়টাস্কফোর্স সিদ্ধান্ত দিলেও এখন অর্থ ছাড়া এসব মিল চালু করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। ফলে মাড়াইয়ে স্থগিতাদেশ উঠলেও বাস্তবে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল এখনো চালু হয়নি। আর কবে নাগাদ বাকি চারটি চিনিকল চালু হবে, তা-ও এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত।
আরও পড়ুনচিনিকলে ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ যুক্তরাজ্যেরবন্ধ চিনিকল পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকারশতকোটি টাকা বিনিয়োগেও কার্যত অচল কেরু চিনিকল
এ নিয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছে না বিএসএফআইসি। এতে আখচাষি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। আবারও থমকে যাওয়ার মুখে পড়েছে স্বদেশনির্ভর চিনিশিল্পের স্বপ্ন।
Advertisement
জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন) এম.এ. কামাল বিল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, বাজেট-বরাদ্দ ছাড়া বন্ধ চিনিকল চালু করা সম্ভব নয়। সেজন্য দুই দফা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছি। ইতিবাচক কোনো সাড়া পাইনি। বরাদ্দ ছাড়া আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না।
তিনি বলেন, বন্ধ মিল নতুন করে চালুর সিদ্ধান্ত বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় কী চায় বা টাস্কফোর্স কী বলেছে- সেটা বড় কথা নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ছাড়ের সম্মতির ওপর বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে। যা এখনো নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে।
বরাদ্দ ছাড়াও দ্বিতীয় সংকট জনবল২০১২ সালে চিনিকলগুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিএসএফআইসি চিনিকলগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিল। এরপর থেকে কোনো জনবল যুক্ত হয়নি। এরমধ্যে ২০২০ সালে ছয়টি মিল বন্ধ হওয়ার পর সেসব মিলের জনবল চালু থাকা অন্য ১৫টি মিলে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বর্তমানে সব চিনিকল ও বিএসএফআইসি মিলে জনবল রয়েছে প্রায় ৬ হাজার। যেখানে প্রয়োজন ১৭ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে পুনরায় ওইসব মিল চালু করলে নিয়োগ দিতে হবে প্রচুর জনবল।
বিএসএফআইসি সচিব মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, টাস্কফোর্স অর্থের জোগানের পাশাপাশি জনবল নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কারণ, আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। আখচাষ উন্নয়নে কৃষিবিদ ও মিল চালাতে ইঞ্জিনিয়ার নেই। যারা ২০১২ সালে এসব কাজে নিয়োগ পেয়েছে তারা পদোন্নতি-বদলি নিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। এসব মিল চালু করলে প্রচুর দক্ষ লোক দরকার। যেটা নিয়োগ দেওয়া আপাতত সম্ভব হচ্ছে না।
আরও পড়ুনঘোষণায় বছর পার, মিল চালুর উদ্যোগ না পেয়ে বাড়ছে উদ্বেগরংপুর চিনিকল চালুর সিদ্ধান্তে আবারো স্বপ্ন বুনছেন শ্রমিক-চাষিরা
বিএসএফআইসির শীর্ষ জনবলেও হযবরলবর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী সরকার কর্তৃক নিয়োজিত একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচজন পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড দিয়ে বিএসএফআইসি পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠান ১৫টি চালু চিনিকল, ছয়টি বন্ধ চিনিকল, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা ও দুটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। এছাড়াও কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সঙ্গে একটি ডিস্টিলারি প্ল্যান্ট ও একটি জৈব সার কারখানা রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের।
তবে এ প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান নেই গত এক বছর। সরকার গত বছরের ২০ জুন সর্বশেষ চেয়ারম্যান ড. লিপিকা ভদ্রকে অবসরে পাঠানোর পর থেকে এখনো এ শীর্ষ পদ ফাঁকা। এছাড়া পাঁচ পরিচালক পদে রয়েছেন চারজন। মহাপরিচালক, পরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ চলছে অতিরিক্ত দায়িত্বে। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের প্রধানের পদও ফাঁকা রয়েছে গত কয়েক বছর ধরে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন শীর্ষ পদে বিএসএফআইসির কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে পদোন্নতি না দিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া রয়েছে। এ নিয়েও এক ধরনের অসন্তোষ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে।
এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল বিল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, এই অর্গানোগ্রামগুলোর বিষয়ে বিএসএফআইসি বলতে পারবে। তারা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত করপোরেশন। বোর্ড ভালো জানে।
তবে এ বিষয়ে বোর্ড পর্ষদের সভাপতি ও বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শামীমুল হকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনএইচ/এমকেআর