মতামত

বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকারের সাহসী পদক্ষেপ

একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার বিনিয়োগ পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং কার্যকর তার ওপর। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শুধু অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় নয়, বরং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার যে প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটতে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ—একই সঙ্গে সাহসী এবং ঝুঁকিপূর্ণও বটে।

Advertisement

দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের খণ্ডিত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)—এই ছয়টি সংস্থা আলাদা আলাদা ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করলেও বাস্তবে তাদের কাজের পরিধি বহু ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে মিলে গেছে। ফলে তৈরি হয়েছে দ্বৈততা, জটিলতা এবং কখনো কখনো অকার্যকারিতা।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার এসব সংস্থাকে বিলুপ্ত করে একটি একীভূত ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা’ গঠনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মূলত প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমরা দেখেছি, অনেক দেশই তাদের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্রীভূত করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সিঙ্গাপুরের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (EDB) কিংবা ভিয়েতনামের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়—এসব প্রতিষ্ঠান একক কর্তৃত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এতদিন বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একাধিক সংস্থার দ্বারস্থ হতে হতো, যেখানে প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব নিয়ম, প্রক্রিয়া এবং সময়সীমা ছিল। এতে করে বিনিয়োগকারীদের সময়, অর্থ এবং ধৈর্য—তিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগও শুধু এই জটিলতার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন একীভূত সংস্থা যদি এই জটিলতা দূর করতে পারে, তাহলে এটি বিনিয়োগ পরিবেশে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

Advertisement

তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন কি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার জন্য যথেষ্ট? বাস্তবতা হলো, প্রশাসনিক সংস্কার তখনই কার্যকর হয়, যখন তা একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকতে হবে দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা, কার্যকর আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

দুর্নীতি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন একটি দেশে বিনিয়োগের কথা ভাবেন, তখন তিনি শুধু সম্ভাব্য মুনাফার দিকটি বিবেচনা করেন না; বরং তিনি দেখেন সেই দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ব্যবস্থা এবং ব্যবসা পরিচালনার বাস্তব পরিবেশ কেমন। যদি কোনো দেশে ঘুষ, অনিয়ম এবং প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে কাজ করতে হয়, তাহলে সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় শুধু নতুন সংস্থা গঠন করলেই বিনিয়োগ বাড়বে—এমনটি ভাবা এক ধরনের সরলীকরণ হবে।

এছাড়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। ছয়টি আলাদা সংস্থার জনবলকে একীভূত করা, তাদের দক্ষতা অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা এবং একটি সমন্বিত কর্মপরিবেশ তৈরি করা সহজ কাজ নয়। যদি এই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তবে ইতিবাচক দিকও কম নয়। একীভূত সংস্থা গঠনের মাধ্যমে সরকার যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে, তাহলে এটি সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে শিল্পায়নের গতি বাড়াতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisement

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আরও দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের এই উদ্যোগ সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীতির ধারাবাহিকতা। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন। তারা এমন একটি পরিবেশ চান, যেখানে নীতিমালা হঠাৎ পরিবর্তিত হবে না এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। তাই নতুন সংস্থা গঠনের পাশাপাশি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যেন বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে।

পরিশেষে বলা যায়, ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে একীভূত করে একটি ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা’ গঠন করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। তবে এই পদক্ষেপের সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। যদি সরকার দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। আর যদি তা ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি শুধু একটি কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবেই থেকে যাবে। কারণ,বিনিয়োগ শুধু নীতির বিষয় নয়; এটি আস্থার বিষয়। সেই আস্থা তৈরি করতে হলে সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপের পাশাপাশি একটি সৎ, স্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তবেই এই উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

এইচআর/জেআইএম