দেশজুড়ে

এক ভিটা থেকে তিন রাষ্ট্রনায়ক, প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাগবাড়ীতে উচ্ছ্বাস

বগুড়া-গাবতলী সড়ক ধরে বাগবাড়ীর দিকে এগোতেই বোঝা যাচ্ছিলো, এটি কোনো সাধারণ দিনের দৃশ্য নয়। রাস্তার দুই পাশে মানুষের ভিড়, হাতে মোবাইল ফোন, কারও চোখে কৌতূহল, কারও চোখে আবেগ। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘আজ আমাদের গ্রামের ইতিহাসের দিন।’

Advertisement

কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল এক অধ্যায়ের সাক্ষী বগুড়ার গাবতলী উপজেলার এই বাগবাড়ী। একই ভিটা থেকে উঠে এসেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তার উত্তরসূরি হিসেবে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, আর এবার সেই পরিবারেরই সন্তান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার পা রাখলেন নিজ পৈতৃক এলাকায়।

সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সড়কপথে বাগবাড়ীতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তার আগমন ঘিরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটে স্থানীয়দের। সকাল থেকেই গাবতলী, নশিপুর, কচুয়া, হাটবাড়ীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে জড়ো হতে থাকেন। কেউ শুধু দেখতে এসেছেন, কেউ শুভেচ্ছা জানাতে, কেউ আবার স্মৃতির টানে।

জিয়াবাড়িতে আবেগঘন দৃশ্য

Advertisement

স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নিজের পৈতৃক ভিটায় ঢোকেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সেখানে যেন হারানো স্মৃতি দেখতে পান। সেই বাড়ি, সেই দেওয়াল, সেই উঠান। অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে যান তিনি। বাড়ির বিভিন্ন ঘর ঘুরে দেখার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এসময় বাইরের কাউকেই সেখানে নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তবে তিনি বাড়িতে প্রবেশের পরপরই জিয়াবাড়ির পক্ষে ওই পরিবারের নিকটজন আশিকুর রহমান সুজন তাদের স্বাগত জানান।

স্থানীয়দের কাছে ‘জিয়াবাড়ি’ নামে পরিচিত বাড়িটি দিনভর ছিল মানুষের ভিড়ে সরব। চারপাশে পুরোনো আমগাছ, পুকুরঘাট, মাটির গন্ধ মেশানো উঠান সব মিলিয়ে বাড়িটিতে এখনো গ্রামবাংলার পুরোনো আবহ টিকে আছে।

প্রবীণ বাসিন্দা আকবর মিয়া বলেন, এই বাড়িটা শুধু একটা বাড়ি নয়, এটা আমাদের ইতিহাস। অনেকদিন পর তাদের এখানে দেখা আমাদের জন্য আবেগের ব্যাপার।

তরুণ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকে শুধু গল্প শুনেছি। আজ নিজের চোখে দেখলাম। ভাই তারেক রহমান আর ভাবি জুবাইদা রহমানকে এত কাছে দেখবো ভাবিনি।

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। কেউ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন, কেউ আবার দূর থেকে দাঁড়িয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

স্থানীয় কৃষক কবির আহম্মেদ বলেন, এই বাড়ির মানুষদের আমরা ছোটবেলা থেকে চিনি। আজ তারা নিজের গ্রামে ফিরেছে। তাও আবার সেইজন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী এটা ভাবতেই বুক ভরে যায়।

জুবাইদা রহমানকে ঘিরে আলাদা আগ্রহ

পুরো সফরে প্রধানমন্ত্রীর পাশে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে স্বামীর পাশে বসতে, মানুষের দিকে হাত নেড়ে সাড়া দিতে ও হাসিমুখে কথা বলতে দেখা যায়। বিশেষ করে গ্রামের নারী ও প্রবীণদের মধ্যে তাকে ঘিরে ছিল বাড়তি আগ্রহ।

বৃদ্ধা সমিরন বেগম বলেন, পুত্রবধূকে আমরা এত কাছে দেখব ভাবিনি। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন এটা মনে থাকবে। এক তরুণী বলেন, এত বড় জায়গার মানুষ হয়েও খুব সাধারণভাবে সবার দিকে তাকাচ্ছিলেন, এটা ভালো লেগেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাকিম বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে খাল খননের কথা বলেছিলেন। আজ তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই পৈতৃক ভিটায় এসে আবার খাল খনন করছেন এটা আমাদের জন্য গর্বের।

দীর্ঘদিন উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে তারা নতুন আশার আলো দেখছেন। লাইলী বেগম বলেন, আমাদের এলাকার সন্তান প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসায় আমরা আনন্দিত। আমরা চাই এখানে উপজেলা হোক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হোক। পার্শ্ববর্তী বাড়ির বাসিন্দা শফিক মিয়া বলেন, এলাকায় শিল্প-কারখানা হলে ছেলেমেয়েরা কাজ পাবে। এখন আমরা সেই আশা করছি।

দিনভর বাগবাড়ী এলাকায় ছিল উৎসবের আবহ। রাস্তার পাশে ছোট দোকানিরা পানি, ফল ও নাশতা বিক্রি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। চা বিক্রেতা আলম বলেন, এত মানুষ একসাথে আগে কখনো দেখিনি। আজকের দিনটা আমাদের জন্য আলাদা।

ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকলেও স্থানীয়দের সহযোগিতায় বড় কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি।

এলবি/এমএন/জেআইএম