দেশজুড়ে

প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’

দেশের স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সরঞ্জাম ও তীব্র জনবল সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার মতো গুরুতর সমস্যার মধ্যেও দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। বাস্তবতার প্রতিকূল স্রোতে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement

একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় করতে হয়। মেধার স্বাক্ষর রেখে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করে তারা পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। এরপর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ পান, তখনই শুরু হয় জীবনের এক নতুন সংগ্রাম।

তেমনই সংকটের গভীর চিত্র দেখা গেছে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালটির চিকিৎসকরা জানান, কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তারা আবাসন সংকটে ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

‘যদি বলি চিকিৎসা দিতে আমাদের কী কী সমস্যা হয়, তাহলে প্রথমেই বলবো নিরাপত্তা সমস্যার কথা। আমরা চাই একজন রোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার, কিন্তু দেখা যায় হঠাৎ যদি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে তখন রোগীর স্বজনরা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে দেখা যাবে, আরও ভালো করে সেবা দিচ্ছি। কিন্তু আমরা সেই ভালো ব্যবহার পাই না।’

Advertisement

আরও পড়ুন:মমেক হাসপাতালে পদে পদে ভোগান্তি‘ডাক্তার হঠাৎ এলেও দালাল আসে নিয়মিত’চার ডাক্তার দিয়ে চলছে ২ লাখ মানুষের হাসপাতাল!

সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে জনবল কাঠামো। লোকবলের অভাব এতটাই প্রকট যে, অনেক সময় চিকিৎসকদের নিজেদের মূল দায়িত্বের বাইরে নার্স বা সহকারীদের কাজও সামলাতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করবে। অতিরিক্ত কাজের চাপে চিকিৎসকরা যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের নিশ্চয়তা না পেলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থোপেডিক্স এবং ট্রমাটোলজিস্ট ও হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. শাহাজালাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। এই হাসপাতালের আশপাশে ভালো আবাসনের জায়গা নেই। এমনকি হাসপাতালের ভেতরে তেমন কোনো ভালো থাকার জায়গা নেই। বিশেষ করে বাথরুমের অবস্থাও শোচনীয়। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা বাজেট সংকটের কথা বলেন। এ কারণেই মূলত ডাক্তাররা গ্রামাঞ্চলে থাকতে চান না।’

Advertisement

‘আমাকে যে গাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেই গাড়ির ড্রাইভার দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাতে হচ্ছে। আমাকে ভিজিটে যেতে হচ্ছে মোটরসাইকেলে। এছাড়াও আমাদের লোকবল কম। নানা সমস্যার মধ্যেও চেষ্টা করি রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করার।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে ভালো এক্স-রে মেশিন নেই। যেটা আছে সেটা অনেক আগের ও অ্যানালগ। পর্যাপ্ত নার্স নেই। আমাদের সহযোগিতার জন্য একজন সেকমো থাকার কথা, তারা জরুরি বিভাগের কাজ করে আমাদের পাশে আসে না। আলট্রাসনোগ্রামের মেশিনও নষ্ট। মেরামতের জন্য চেষ্টা করছি।’

আরও পড়ুন:বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালঘরে ঘরে উপসর্গ নিয়ে ঘুরছে শিশুরা, উদাসীনতায় বাড়ছে হামযন্ত্র সংকটে ধুঁকছে বিশেষায়িত ইউনিট, সেবা পাচ্ছে না নবজাতক

হাসপাতালটির চিকিৎসা কর্মকর্তা অসীম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘যদি বলি চিকিৎসা দিতে আমাদের কী কী সমস্যা হয়, তাহলে প্রথমেই বলবো নিরাপত্তা সমস্যার কথা। আমরা চাই একজন রোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার, কিন্তু দেখা যায় হঠাৎ যদি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে তখন রোগীর স্বজনরা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে দেখা যাবে, আরও ভালো করে সেবা দিচ্ছি। কিন্তু আমরা সেই ভালো ব্যবহার পাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন বহির্বিভাগে রোগী দেখি তখন রোগীর সঙ্গে যারা আসেন তারা অনেক সমস্যা করেন। সিরিয়াল দেওয়ার জন্য যে স্টাফ প্রয়োজন সেই স্টাফ নেই। হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চালক নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার গাড়ির ড্রাইভার অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসা কর্মকর্তা কাউসার মাহামুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালটি মানিকগঞ্জ থেকে অনেক দূরে ও দুর্গম এলাকায়। এই এলাকায় এসে আমি যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছি এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বিদ্যুতের সমস্যা। বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকে। গরমের মধ্যে কষ্ট করে রোগী দেখতে হয়। এতে আমাদেরও সমস্যা হয় রোগীদেরও সমস্যা হয়। হাসপাতালে লোকবল একেবারেই কম। রেজিস্ট্রি নেওয়া চিকিৎসা দেওয়া সব কিছুই আমাদের করতে হয়।’

হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজী এ কে এম রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাকে যে গাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেই গাড়ির ড্রাইভার দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাতে হচ্ছে। আমাকে ভিজিটে যেতে হচ্ছে মোটরসাইকেলে। এছাড়াও আমাদের লোকবল কম। নানা সমস্যার মধ্যেও চেষ্টা করি রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করার।’

এমএন/এএসএম