ডায়াবেটিস এখন আর শুধু একটি রোগ নয়, বরং জীবনযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের জন্য। একসময় ধারণা ছিল ডায়াবেটিস মানেই চিনি বা মিষ্টি খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
Advertisement
কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সাদাকালো নয়। সচেতনতা, পরিমিতি এবং সঠিক জীবনধারার মাধ্যমে চিনি খেয়েও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চলুন জেনে নেই কীভাবে বাস্তবসম্মত উপায়ে মিষ্টি খেয়েও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
চিনি কি একেবারেই নিষিদ্ধ?প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা দরকার, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। আসলে মূল বিষয়টি হলো মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ। চিনি বা মিষ্টি খাবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়ায়। তবে আপনি যদি আপনার দৈনিক ক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং শারীরিক কার্যকলাপের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারেন, তাহলে অল্প পরিমাণে চিনি খাওয়াও সম্ভব।
চিনি খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিমিতি। তাই-
Advertisement
খালি পেটে চিনি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। তাই কখনোই খালি পেটে মিষ্টি খাবেন না, প্রধান খাবারের পর অল্প মিষ্টি খেলে গ্লুকোজের ওঠানামা তুলনামূলক কম হয়, প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবারের সঙ্গে মিষ্টি খেলে শর্করা ধীরে শোষিত হয়। যেমন: ভাত, সবজি ও মাছ খাওয়ার পর সামান্য মিষ্টি খাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ।
আরও পড়ুন: গরমে সন্তানের পরীক্ষা, অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি ক্লান্ত হলেও কাজে মনোযোগ রাখবেন যেভাবে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বুঝে খাবার বেছে নিনসব মিষ্টি খাবার সমান ক্ষতিকর নয়। কিছু খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম থাকে, অর্থাৎ এগুলো ধীরে ধীরে রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত খাবারের মধ্যে রয়েছে ফল (যেমন আপেল, পেয়ারা), ডার্ক চকলেট (পরিমিত), ওটস বা লাল আটার তৈরি খাবার।
অন্যদিকে উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত খাবার যেমন সাদা চিনি, মিষ্টি পানীয় বা পেস্ট্রি এগুলো যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।
বিকল্প মিষ্টির ব্যবহারআজকাল বাজারে বিভিন্ন ধরনের সুগার সাবস্টিটিউট পাওয়া যায়, যেমন: স্টেভিয়া, সুইটনার ট্যাবলেট। এগুলো সরাসরি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না। তবে এগুলো ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
Advertisement
আপনি যদি মিষ্টি খান, তাহলে সেটি পোড়ানোর জন্য শরীরকে সক্রিয় রাখতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করুন, খাবারের পর হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ব্যায়াম শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়, ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুনআপনি কতটা চিনি খেতে পারছেন, তা নির্ভর করে আপনার শরীরের প্রতিক্রিয়ার ওপর। নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করুন, কোন খাবারে সুগার বাড়ছে, তা লক্ষ্য করুন, নিজের শরীরের জন্য একটি ‘সেফ লিমিট’ নির্ধারণ করুন। এটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে, আপনার জন্য কতটা মিষ্টি নিরাপদ।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুনঅতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন, তেল-চর্বি ও অতিরিক্ত ক্যালোরি কমান, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে অল্প পরিমাণ চিনি খেয়েও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
মানসিক চাপ কমানোও জরুরিস্ট্রেস বা মানসিক চাপ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন, ধ্যান বা মেডিটেশন করুন, নিজের পছন্দের কাজে সময় দিন। মনে রাখবেন, শুধু খাবার নয়; মানসিক অবস্থাও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।
চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন নিজে নিজে ডায়েট ঠিক না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন ওষুধ বা ইনসুলিন নিয়মিত গ্রহণ করুন নতুন কোনো খাবার যুক্ত করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন বাস্তবতা মেনে সচেতন জীবনযাপনডায়াবেটিস মানেই জীবনের সব আনন্দ শেষ, এটা সত্য নয়। বরং সচেতনভাবে চললে আপনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। চিনি খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ না করে বরং স্মার্টলি ম্যানেজ করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। এতে করে আপনি মানসিকভাবে ভালো থাকবেন, আবার শারীরিক সুস্থতাও বজায় থাকবে।
চিনি খেয়েও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, তবে সেটি নির্ভর করে আপনার সচেতনতা, পরিমিতি এবং জীবনযাপনের ওপর। অল্প পরিমাণে মিষ্টি খাওয়া কোনো সমস্যা নয়, যদি আপনি নিয়ম মেনে চলেন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক স্বস্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ এই চারটি স্তম্ভই আপনাকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, ‘নিষেধ’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রণ’ এটাই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার মূলমন্ত্র।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস, ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন
জেএস/