সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরুর চর্বি দিয়ে তৈরি ময়েশ্চারাইজার (ট্যালো বাম) থেকে শুরু করে স্যামন মাছের শুক্রানু দিয়ে তৈরি ফেসিয়ালের মতো প্রাণীভিত্তিক স্কিনকেয়ার পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। কৃত্রিম উপাদানের বিকল্প হিসেবে প্রচার করা এসব পণ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিলাসবহুল স্পা, কৃষকের বাজার ও ঘরোয়া রান্নাঘরেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক উপাদানের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নোরা ম্যাককেনড্রিক বলেন, গত কয়েক বছরে প্রাণীভিত্তিক খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এর কিছুটা প্রভাব কসমেটিক জগতেও পড়েছে।
৩১ বছর বয়সী নাটালি কিনান বলেন, প্রাকৃতিক স্কিনকেয়ার খুঁজতে গিয়ে তিনি প্রক্রিয়াজাত গরুর চর্বি (ট্যালো বাম) ব্যবহার শুরু করেন। প্রথম যে পণ্যটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি ভারী ও গরুর গন্ধযুক্ত মনে হয়েছিল। তবে সম্প্রতি তিনি নারকেল সুগন্ধযুক্ত হালকা ট্যালো বাম পেয়েছেন।
Advertisement
তিনি বলেন, আমি অল্প ব্যবহার করি, কিন্তু এতেই ত্বক মসৃণ থাকে।
বছরের পর বছর দুগ্ধ খামারি হিসেবে কাজ করার পর ব্রায়ান ভ্যান্ডার ডুসেন এখন গরুর মাংস বিক্রির ব্যবসায় যুক্ত। তবে গত এক বছরে তিনি ও তার স্ত্রী আরেকটি নতুন পথে হাঁটছেন। নিজেদের রান্নাঘরে পশুর অঙ্গের চর্বি ব্যবহার করে তৈরি করছেন ‘ট্যালো বাম’, যা ক্রেতারা ত্বকে ব্যবহার করছেন।
তবে এই পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন ফর্মুলা তৈরি করা, যাতে এটি রান্না করা মাংসের মতো গন্ধ না ছড়ায়।
ব্রায়ান বলেন, এটা এখন সর্বত্র দেখা যাচ্ছে, তাই ভাবলাম আমরাও করি। অনেকেই বলেন, আমরা গরুর মতো গন্ধ পেতে চাই না’, তাই আমরা ল্যাভেন্ডার ও বুনো কমলার মতো উপাদান যোগ করি।
Advertisement
প্রাণীভিত্তিক উপাদানের ফিরে আসা
স্বাধীন কসমেটিক রসায়নবিদ পেরি রোমানোস্কি জানান, প্রাণীর ওপর পরীক্ষার উদ্বেগ ও ‘ম্যাড কাউ’ রোগের মতো সংকটের কারণে কয়েক দশক আগে কসমেটিক শিল্প প্রাণীভিত্তিক উপাদান থেকে সরে আসে। পরবর্তী সময়ে ভেগান বিউটি পণ্যের উত্থানও এসব উপাদান এড়িয়ে চলার প্রবণতা বাড়ায়। তবে সম্প্রতি এসব উপাদান আবারও ফিরে আসছে ও ‘প্রাকৃতিক বিকল্প’ হিসেবে বাজারজাত হচ্ছে।
উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার সোনোমা মাউনটেইন বিফের প্রতিষ্ঠাতা জেমি মুডি বলেন, অপচয় কমানোর জন্যই তিনি ট্যালো পণ্য তৈরি শুরু করেন। পরিষ্কার পণ্যের চাহিদা থাকায় বাজার আরও বাড়বে।
ভ্যান্ডার ডুসেন বলেন, তারা মূলত চলমান ট্রেন্ডে যুক্ত হয়েছেন। আজকের বিশ্বে শুধু কী ব্যবহার করছেন তা নয়, এটি কোথা থেকে আসছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ট্যাম্পায় একটি স্পার মালিক কেলি প্র্যাট বলেন, স্যামনের শুক্রানু ফেসিয়ালের মতো চিকিৎসার চাহিদা বেড়েছে, কারণ গ্রাহকরা সময়ের সঙ্গে উন্নতি দেখছেন। একই স্পার অ্যাস্থেটিশিয়ান ক্যাসান্দ্রা হাচিসন জানান, এই উপাদান ত্বক মেরামত ও প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত হয়। এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে ও বাইরের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
দামের দিক থেকে ট্যালো বামের একটি পাত্র মার্কিন সুপারশপ ‘টার্গেট’-এ পেট্রোলিয়াম জেলির তুলনায় প্রায় ১৫ ডলার বেশি দামে বিক্রি হয়। অন্যদিকে, স্যামন মাছের শুক্রানু দিয়ে তৈরি কিছু পণ্য ঘরে ব্যবহার করা গেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্পাতে প্রয়োগ করতে হয়, যা অতিরিক্ত খরচ তৈরি করে।
খরচ বাড়লেও এসব পণ্যের ওপর থেকে ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। গুগল ট্রেন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ‘বিফ ট্যালো ফর স্কিন’ এর মতো সার্চ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে ও উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণীজ বর্জ্যকে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা টেকসইতার একটি উদাহরণ।
কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
তবে এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নিউইয়র্কের ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যাঞ্জেলো ল্যান্ড্রিসিনা বলেন, বিফ ট্যালো বা স্যামন শুক্রানুর কার্যকারিতা প্রমাণে শক্তিশালী চিকিৎসা তথ্য নেই। সিয়াটলের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেদার রজার্সও একমত। তিনি বলেন, ট্যালো সহজেই নষ্ট হতে পারে ও এতে যোগ করা সুগন্ধি উপাদান ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।
রোমানোস্কি বলেন, ভোক্তাদের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত। তিনি জানান, রেটিনল ও নিয়াসিনামাইডের মতো কিছু উপাদানের কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলেও অন্যান্য অনেক উপাদান খুব সামান্য উপকার দেয়, যা সহজে বোঝা যায় না।
দক্ষিণ ক্যারোলিনার লোকান্ট্রি ফ্যামিলি ফার্মসের মালিক কোরিন ডায়াল বলেন, প্রায় দুই বছর আগে তিনি তার শিশুর জন্য প্রাকৃতিক বাম খুঁজতে গিয়ে ট্যালো ব্যবহার শুরু করেন। অনেকেই রাসায়নিক পণ্য এড়িয়ে চলতে চান। এক গ্রাহকের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত এক নারী চিকিৎসকের পরামর্শে ত্বকে ব্যবহৃত পণ্য নিয়ে সতর্ক ছিলেন।
ডায়াল বলেন, অনেক মানুষ রাসায়নিক পণ্য থেকে সরে আসছেন। তারা জানতে চান তারা কী ব্যবহার করছেন এবং কোথা থেকে আসছে।
রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাককেনড্রিক মনে করেন, মায়েরা এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছেন, কারণ তারা শিশুদের জন্য পণ্য কেনার সময় বেশি সতর্ক থাকেন। শিশুদের জন্য পণ্য কেনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যেখানে ঝুঁকি বেশি।
ডা. ল্যান্ড্রিসিনা বলেন, স্যামনভিত্তিক স্কিনকেয়ারকে ‘সবচেয়ে নতুন ট্রেন্ড’ হিসেবে প্রচার করার পেছনে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের উদ্ভাবনী ভাবমূর্তির প্রভাব থাকতে পারে। অন্যদিকে বিফ ট্যালোর ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক ও পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া’ মানসিকতা কাজ করে। তবে তিনি বলেন, পুরোনো বা নতুন- যাই হোক, স্কিনকেয়ারের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে।
রোমানোস্কি বলেন, বিউটি ইন্ডাস্ট্রি সবসময় নতুন কিছু বাজারে আনার চাপের মধ্যে থাকে। তার ভাষায়, কসমেটিক শিল্পকে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মতো ভাবা উচিত। আপনি শার্টে কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত শার্টই থাকে- ঠিক তেমনই কসমেটিক পণ্যও।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
এসএএইচ