মতামত

কষ্টের মহিমা ও অদৃশ্য খাল কাটা

আগে যারা নিপুণ বর্ণনায় অনুপম ভাষায় গল্প-উপন্যাস লিখত, তাদের বলা হতো কথাশিল্পী। যেমন আমরা শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বলতাম অমর কথা শিল্পী। এখন অবশ্য কথাশিল্পীর ধরন পাল্টেছে। এখন মানুষ পড়ে কম, বলে এবং শোনে বেশি। এখনকার কথাশিল্পী তারাই, যারা কথার জাদুতে দিনকে রাত, রাতকে কাত করেত পারে। যেকোনো কিছু নিজের মতো ব্যাখ্যা করতে পারে। শ্রোতাদের সেই ব্যাখ্যা গেলাতে পারে। এখনকার কথাশিল্পী হলেন যারা টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টকশো করে। এদের ইউটিউবার ইনফ্লুয়েন্সার ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। এরাই মূলত আধুনিক কালের কথাশিল্পী। তেমন একজন কথাশিল্পী বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কথার জুদুতে সবাইকে মোহিত করার চেষ্টা করছেন, আগের মতো।

Advertisement

হ্যাঁ, বলছিলাম প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহীদ উর রহমানে কথা। ভদ্রলোক এক সময় বিগত সরকারের ‘ফ্যাসিস্ট’ কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে, সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অপরিসীম অবদান রেখেছেন।

এখানে বলে রাখা ভালো, বিগত সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে সব দায় তাদের ঘাড়ে চাপানো এখন আমাদের রাজনীতিতে দায়মুক্তির এক শর্টকাট তরিকায় পরিণত হয়েছে। যেন এটি শুধু একটি শব্দ নয়, এক অলৌকিক মেশিন—যে মেশিনে বর্তমানের সব ব্যর্থতা ধুয়ে ফেলা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, এই তরিকাটি এতটাই কার্যকর যে একটা বিশেষ শ্রেণির মগজে এখনো স্থায়ীভাবে বসে আছে—‘যাই হোক, ফ্যাসিস্ট তো নেই!’

এই বাক্যটি এখন এক ধরনের সর্বজনীন প্রতিষেধক। ঘরে ভাত নেই?—তাতে কী, ফ্যাসিস্ট তো নেই! রাস্তায় ছিনতাইয়ের শিকার হলেন?—আরে ভাই, অন্তত ফ্যাসিস্ট নেই! হাসপাতালে ওষুধ নেই, স্কুলে শিক্ষক নেই, বাজারে আগুন?—তাতে কী! ফ্যাসিস্ট তো নেই, সেটাই তো বড় কথা! যেন জীবনের সব সংকটকে এক বাক্যে বাতিল করে দেওয়ার এক অলিখিত লাইসেন্স পেয়ে গেছে এই বিশেষ শ্রেণি।

Advertisement

এই মনস্তত্ত্বের মধ্যে একটা অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি আছে। মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু সেই কষ্টকে তারা এক ধরনের নৈতিক বিজয় হিসেবে উপভোগ করছে। যেন তারা বলছে—‘হ্যাঁ, আমরা কষ্টে আছি, কিন্তু অন্তত আমরা ‘ঠিক’ পক্ষে আছি।’ এই ‘ঠিক’ থাকার সুখটাই এখন সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।

যাহোক, সম্প্রতি মহান কথাশিল্পী ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘যখনই তেলের দাম বাড়ছে, ভাড়া বাড়ছে—দ্রব্যমূল্য ওই অজুহাতে যতটুকু বাড়ার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা চেষ্টা করবো এটা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। জনগণকে আবারও বলছি কিছুটা কষ্ট করতে হবে—প্রত্যেকটা মানুষ কষ্ট করছে।’

এই বক্তব্য শোনার পর ডা. জাহেদ সাহেবকে একজন জ্ঞানী ঋষি বলে মনে হয়েছে। তার বক্তব্যে এখন শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা নেই, আছে দর্শন, আছে আধ্যাত্মিকতা। রাষ্ট্র পরিচালনা যেন আর প্রশাসনিক কাজ নয়, এক ধরনের নৈতিক সাধনা। এই সাধনার মূলমন্ত্র—‘কষ্ট করো, তবেই মুক্তি।’

দেশটা যেন হঠাৎ করে এক বিশাল যোগাশ্রমে রূপ নিয়েছে। পার্থক্য শুধু এই—যোগাশ্রমে মানুষ নিজের ইচ্ছায় যায়, আর এখানে মানুষকে বাধ্য হয়ে যেতে হয়। এবং প্রতিবার যাওয়ার আগে তাকে বলা হয়—‘কিছুটা কষ্ট করতে হবে—প্রত্যেকটা মানুষ কষ্ট করছে।’

Advertisement

এই ‘প্রত্যেকটা মানুষ’ কথাটার মধ্যে এক ধরনের চমৎকার সমতা আছে। এখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই—সবাই নাকি একই কষ্টে নিমজ্জিত। তবে বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কারও কষ্ট এয়ারকন্ডিশনের ভেতরে বসে অনুভূত হয়, কারও কষ্ট খোলা আকাশের নিচে। কারও কষ্ট ব্যাংকের হিসাব দেখে, কারও কষ্ট বাজারের দামের তালিকা দেখে। তবুও বলা হয়—সবাই সমান কষ্টে আছে। যেন কষ্টও এখন এক ধরনের জাতীয় সম্পদ, যা সমানভাবে বণ্টন করা হয়েছে!

তেলের দাম বাড়ে। ভাড়া বাড়ে। দ্রব্যমূল্য বাড়ে। তেলের দাম বাড়ানোর পর ঘোষণা আসে—জিনিসপত্রের দাম যতটা বাড়ার কথা, তার চেয়েও বেশি বাড়ছে। এই বক্তব্য শুনে সাধারণ মানুষ একটু থমকে যায়। কারণ তারা এতদিন ভেবেছিল, দাম বাড়ছে তাদের দুর্ভাগ্যের কারণে। এখন জানা গেল, দাম বাড়ছে ‘অতিরিক্তভাবে’—অর্থাৎ এক ধরনের অতিরিক্ত উপহার!

তখন প্রশ্ন জাগে—এই অতিরিক্ত অংশটা কে বাড়াচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে? দোকানদার বলে, ‘ভাই, পাইকারি দামই বেশি।’ পাইকার বলে, ‘আমাদের খরচ বেড়েছে।’ মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য সত্তা আছে, যে এই বাড়তি অংশটা গিলে ফেলছে। তাকে কেউ দেখে না, কিন্তু সবাই তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। যেন অর্থনীতির নতুন তত্ত্ব—‘অদৃশ্য পকেট’!

কিন্তু চিন্তার কিছু নেই। বলা হয়েছে—‘আমরা চেষ্টা করবো এটা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।’ এই ‘চেষ্টা’ শব্দটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। কারণ চেষ্টা করতে কোনো খরচ নেই, ব্যর্থ হলেও দায় নেই। চেষ্টা সফল হলে কৃতিত্ব, ব্যর্থ হলে পরিস্থিতির দোষ। এদিকে জনগণের জন্য বার্তা একটাই—কষ্ট করতে হবে। যেন কষ্ট না করলে নাগরিকত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। আপনি যদি একটু আরামে থাকতে চান, তখনই কেউ এসে জিজ্ঞেস করবে—’আপনি কি দেশের কথা ভাবছেন না?’

ধীরে ধীরে মানুষ এই দর্শনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন তারা কষ্টকে শুধু মেনে নেয় না, বরং উদযাপনও করে। গ্যাসের দাম বাড়লে বলে—‘আলহামদুলিল্লাহ, অন্তত ফ্যাসিস্ট নেই!’ লোডশেডিং হলে মোমবাতির আলোয় ছবি তুলে পোস্ট দেয়—’অন্ধকারে আলো খুঁজে নিচ্ছি!’

বাসভাড়া বাড়ে—মানুষ একটু গালি দেয়, তারপর নিজেকে সান্ত্বনা দেয়—‘চলুক, স্বাধীনভাবে ভাড়া দিচ্ছি!’ বিদ্যুতের বিল বাড়ে—বিল হাতে নিয়ে কেউ কেউ এমনভাবে হাসে, যেন এটি কোনো পুরস্কার। কারণ এই বিল প্রমাণ করে—তারা এখনও ব্যবস্থার অংশ। এদিকে শিশু টিকার অভাবে মারা যায়। কিন্তু সেটাও একসময় পরিসংখ্যান হয়ে যায়। কেউ বলে—‘দুঃখজনক, কিন্তু ফ্যাসিস্ট তো নেই।’ এই ‘ফ্যাসিস্ট’ এতটাই বড় যে, এর মধ্যে ছোট মানুষের জীবন আর চোখে পড়ে না।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে আসে আরেক বিস্ময়—খাল খনন। এখানেও কথাশিল্পী ডা. জাহীদ উর রহমানের নাম এসে যায়। তিনি জানিয়েছেন, দেশের প্রায় অর্ধেক খালের খনন কাজ শেষ!

এর আগে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। তারপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জানানো হলো—এর অর্ধেক কাজ শেষ! এখানেই সাধারণ মানুষ একটু ধাক্কা খায়। কারণ তারা জানে, তাদের এলাকায় একটা ছোট ড্রেন পরিষ্কার করতেও মাসের পর মাস লেগে যায়। সেখানে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন হয়ে যাচ্ছে চোখের পলকে!

তখন প্রশ্ন ওঠে—এই খালগুলো কোথায়? কেউ কি দেখেছে? নাকি এগুলো এক ধরনের অদৃশ্য অবকাঠামো? হয়তো এগুলো ‘ভার্চুয়াল খাল’—ডিজিটাল উন্নয়নের অংশ। ভবিষ্যতে হয়তো একটি অ্যাপ আসবে—‘e-Khal।’ সেখানে লগইন করলে দেখা যাবে—আপনার এলাকায় ১০ কিলোমিটার খাল খনন হয়েছে। আপনি চাইলে সেটাতে ভার্চুয়াল নৌকাও চালাতে পারবেন! অথবা খালগুলো এত সূক্ষ্মভাবে খনন করা হয়েছে যে খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো ‘ন্যানো-খাল’—যা শুধু রিপোর্টে থাকে, বাস্তবে নয়।

আর টাকাপয়সার প্রশ্ন তোলা তো আরও বড় সমস্যা। এত টাকা কোথা থেকে এলো—এই প্রশ্ন করা মানে উন্নয়নকে সন্দেহ করা। আর উন্নয়নকে সন্দেহ করা মানে—দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

কেউ কেউ অবশ্য মজা করে বলে—খালের বদলে সুড়ঙ্গের কথা বললে ভালো হতো। সুড়ঙ্গ অন্তত চোখে না পড়লেও বিশ্বাস করা সহজ। খাল তো দৃশ্যমান হওয়ার কথা—সেটাই যখন দেখা যায় না, তখন একটু সমস্যা হয়।

যদিও এসব ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার চেয়ে বিশ্বাস করা ভালো। কারণ কষ্ট + বিশ্বাস = স্থিতিশীলতা; সন্দেহ + প্রশ্ন = সমস্যা। তাই মানুষ কষ্ট বেছে নেয়, বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে। কারণ এতে অন্তত মানসিক শান্তি আছে।

এই বিশ্বাসটাই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি। এই বিশ্বাস থাকলে খাল না থাকলেও খাল আছে বলে মনে হয়। এই বিশ্বাস থাকলে কষ্টও গৌরব হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত মনে হয়, আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি—যেখানে বাস্তবতার চেয়ে বয়ান বেশি শক্তিশালী। যেখানে কষ্ট একটি নীতি, আর উন্নয়ন একটি ধারণা। এবং এই যুগে সবচেয়ে সফল মানুষ সে-ই, যে কষ্ট পেয়ে হাসতে পারে, আর অদৃশ্য খাল দেখে হাততালি দিতে পারে। কারণ এখানে সত্যটা খুব সহজ: আপনি যদি কষ্ট পান, আপনি দেশপ্রেমিক। আর আপনি যদি প্রশ্ন করেন, আপনি সমস্যার অংশ।

তাই কষ্ট করুন, হাসুন, আর মাঝে মাঝে খোঁজ নিন—আপনার আশেপাশে কোনো নতুন খাল খনন হয়েছে কিনা। না পেলে দুশ্চিন্তা করবেন না—হয়তো সেটা এখনও ‘দৃশ্যমান হওয়ার পথে।’

এইচআর/এমএস