দেশজুড়ে

তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও টাকার অভাবে অনিশ্চয়তায় ফাহিম

অভাব আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার শিক্ষার্থী ফাহিম মিয়া। তবে অর্থাভাবে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ভর্তির টাকা জোগাড় করতে পারছেন না ফাহিম।

Advertisement

ফাহিম মিয়া উপজেলার তাঁতিহাটি ইউনিয়নের জানকিখিলা এলাকার বাসিন্দা। ফাহিমের বাবা মো. মোখলেছুর রহমান একজন মৌসুমী দিনমজুর। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ফাহিম ছোট থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, মাত্র তিন বছর বয়সে পারিবারিক কলহের জেরে ফাহিমের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর দাদির কাছেই তার বেড়ে ওঠা। বর্তমানে দাদির দুঃসম্পর্কের খালাতো ভাই লুৎফর রহমানের জমিতে একটি দোচালা ঘরে পরিবারসহ বসবাস করছেন তারা। ঘরের এক কক্ষে ফাহিমের বাবা ও সৎমা এবং অন্য কক্ষে ফাহিম ও তার দাদি থাকেন। পরিবারটির নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। দিন চলে অনিশ্চয়তা আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে।

এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও দমে যাননি ফাহিম। শ্রীবরদী এ পি পি আই হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৪.৫৮ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। অর্থাভাবে কোনো কোচিংয়ে ভর্তি হতে না পারলেও অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনা ও আত্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন তিনি।

Advertisement

তার সেই চেষ্টার ফলও মিলেছে। ফাহিম গুচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ইউনিটে ৪৯০৬তম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি ইউনিটে ৩৮২তম এবং কৃষি গুচ্ছে অপেক্ষমাণ তালিকায় ৬৮৫৩তম স্থান অর্জন করেছেন যা তার মতো প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন শিক্ষার্থীর জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

ফাহিম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ হাজার টাকার প্রয়োজন। এছাড়া ভর্তি-পরবর্তী প্রথম কয়েক মাস থাকার খরচ হিসেবে প্রতি মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দরকার। পরে টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।

ফাহিম আরও বলেন, ছোট থেকেই খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করছি। আমরা ভূমিহীন। নবম শ্রেণি থেকেই টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছি। মাঝে মধ্যে মা, আপা ও ফুপু কিছু টাকা দিয়ে সহায়তা করেছেন। কোনো কোচিং করিনি, অনলাইনে ক্লাস করে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু টাকার অভাবে কীভাবে ভর্তি হবো বুঝতে পারছি না। প্রয়োজনে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করে হলেও টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করবো।

ফাহিমের আশ্রয়দাতা লুৎফর রহমান বলেন, তাদের কোনো জমিজমা নেই, তাই মানবিক কারণে থাকার জন্য জায়গা দিয়েছি। ফাহিম খুব মেধাবী ছেলে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, এটা আমাদের জন্য আনন্দের। কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অনেক টাকার প্রয়োজন, যা তাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ছেলেটা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।

Advertisement

ফাহিমের বাবা মোখলেছুর রহমান বলেন, আমি গরিব মানুষ, জমি-জমা কিছুই নেই। ছেলেটা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করছে। আমি টাকা দিতে পারিনি। এখন সে বলছে গার্মেন্টসে কাজ করে টাকা জোগাড় করবে। কেউ যদি সাহায্য করতো, তাহলে সে অনেক দূর যেতে পারতো।

শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রিফাত আহমেদ বলেন, ফাহিম অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। অর্থাভাবই তার নীরবতার মূল কারণ ছিল। কোচিং ছাড়াই নিজ প্রচেষ্টায় সে গুচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৯০৬তম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি ইউনিটে ৩৮২তম স্থান অর্জন করেছে। বিজ্ঞান বিভাগে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও সে যে এগিয়ে গেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এখন তার পথচলা যেন থেমে না যায়, সে জন্য সমাজের সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহমেদ বলেন, ফাহিমের বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। সে লিখিতভাবে আবেদন করলে সরকারিভাবে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব, আমরা তা করবো।

মো. নাঈম ইসলাম/এফএ/এএসএম