রাজধানীর তেজগাঁও থানায় বিস্ফোরক আইনে করা একটি মামলায় দেড় মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে কারাগারে যাওয়া যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগম জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার শুনানি শেষে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মানবিক বিবেচনায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।
Advertisement
তবে শিল্পী বেগমের কারামুক্তির পরই প্রশ্ন উঠেছে—‘এত ছোট একটি শিশুর মায়ের সঙ্গে কারাগারে রাত কাটাতে হলো। শিশুটির কী অপরাধ ছিল?’
বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুর ১২টার কিছু আগে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান শিল্পী বেগম। এসময় পরিবারের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
আদালতের হাতে ‘ডিসক্রেশনারি পাওয়ার’ বা বিবেচনামূলক ক্ষমতা থাকে, যা বিশেষ ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করা সম্ভব
Advertisement
জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করে শিল্পী বেগমের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জাগো নিউজকে বলেন, গতকাল দুপুরে জামিন নামঞ্জুর করে শিল্পীকে কারাগারে পাঠানো হয়। সন্ধ্যায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিএমএম) পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে আদালত মানবিক বিবেচনায় তাকে জামিন দেন। গতকাল আমরা দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণে জামিননামা দাখিল করতে পারিনি। আজ জামিননামা দাখিলের পর দুপুর ১২টার কিছু আগে কাশিমপুর কারাগার থেকে শিল্পী বেগম মুক্তি পান।
শিল্পী বেগমের কারামুক্তির পর প্রতিক্রিয়া দেন তার আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর দেড় মাসের শিশুসন্তানকে নিয়ে কারাগারেই রাত কাটে শিল্পী বেগমের।
তার মুক্তির পর বিভিন্ন মাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। দেড় মাসের সন্তান নিয়ে কারাগারে থাকার এ ঘটনাকে ‘অত্যন্ত হৃদয়বিদারক’ উল্লেখ করে আসামির আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন—শিশুটির কী অপরাধ ছিল যে তাকে মায়ের সঙ্গে এক রাত কারাগারে থাকতে হলো?
Advertisement
আরও পড়ুনমুক্তি পেলেন দেড় মাসের বাচ্চার মা সেই যুব মহিলা লীগ নেত্রী
আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেন, আদালতের হাতে ‘ডিসক্রেশনারি পাওয়ার’ বা বিবেচনামূলক ক্ষমতা থাকে, যা বিশেষ ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করা সম্ভব। কিন্তু এই মামলার শুরুতে (অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে) জামিন না হওয়ায় সে প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকার কারণে বিষয়টি গুরুত্ব পায় এবং পরে আদালত তা বিবেচনায় নিয়ে জামিন দেন। শুধু শিল্পী বেগমের ক্ষেত্রেই নয়, এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যা আড়ালে থেকে যায় এবং সেগুলোতে হয়তো ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পান না।
এ আইনজীবী মনে করেন, সংবেদনশীল ও মানবিক দিক বিবেচনায় এ ধরনের মামলায় আদালতের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত। দেড় মাসের শিশুর মাকে জামিন দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করায় আদালতকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
শিল্পী বেগম ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গত সোমবার সন্ধ্যায় তেজকুনিপাড়ার রেলওয়ে কলোনি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দায়ের করা বিস্ফোরকদ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির একাধিক ধারার মামলায় শিল্পী বেগমকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, বাদীর ছেলে মো. তাহমিদ মুবিন রাতুল (২১), যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চানখাঁরপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বুধবার দুপুরে কাশিমপুর কারাগার থেকে শিশুসন্তান নিয়ে বের হয়ে আসেন শিল্পী বেগম
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় আসামির নির্দেশে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র, পিস্তল ও বোমা নিয়ে বাদীর বাসায় হামলা চালায়। এতে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর, লুটপাট এবং প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। হামলায় বাদীর স্বামী সোহেল রানা গুরুতর আহত হন এবং তার হাত ভেঙে যায় বলেও উল্লেখ করা হয়। এছাড়া হামলাকারীরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি ও হত্যার হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে আসামির সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পরে তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেল হাজতে রাখার আবেদন মঞ্জুর করেন।
এমডিএএ/এমকেআর